নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক নবপ্রকাশ
রাজধানী ঢাকার ভোর মানেই একসময় ছিল কাকের কোলাহল আর ডাকাডাকি। ছাদে, বিদ্যুতের তারে কিংবা রাস্তার মোড়ে ঝুলানো ডাস্টবিনে ওদের উপস্থিতি ছিল প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই চেনা দৃশ্যটি যেন দ্রুত ম্লান হয়ে আসছে। তিলোত্তমা এই মেগাসিটিতে আজ কাকের দেখা মেলা দুষ্কর, যা শহরের ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকটের এক নীরব সংকেত দিচ্ছে।
পাখি পর্যবেক্ষকদের মতে, একসময় ঢাকার সকাল জুড়ে যেসব পাখির অবিরাম গুঞ্জন থাকত, তার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল পাতি কাক (Corvus splendens) এবং দাঁড় কাক (Corvus macrorhynchos)। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে কেবল সাধারণ মানুষই নন, গবেষকরাও লক্ষ্য করছেন যে শহরের শব্দজগৎ থেকে এই অতিপরিচিত পাখিটি যেন নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে।
কেন কমছে কাকের সংখ্যা?
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একক কোনো কারণে নয় বরং একাধিক নাগরিক ও পরিবেশগত চাপের ফলেই ঢাকায় কাকের উপস্থিতি সংকটে পড়েছে:
-
আবাসস্থল ধ্বংস ও বৃক্ষনিধন: ঢাকার পুরোনো দিনের বাড়িগুলোর আঙিনা, আম বা মেহগনি গাছের বাগান কিংবা উন্মুক্ত জলাশয়গুলো আবাসন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে কয়েকটি গাছ টিকে রয়েছে, প্রজনন মৌসুমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে সেগুলোর ডালপালা ছাঁটাই করায় কাকের বাসা তৈরির সুযোগ কমেছে।
-
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খাদ্যাভাব: ঢাকাকে আরও পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগে উন্মুক্ত ময়লার স্তূপের পরিবর্তে এখন আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হলেও শহরের মেথর পাখি হিসেবে পরিচিত কাকের সহজ খাবারের উৎস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া উন্মুক্ত থাকা খাবারে প্লাস্টিক ও রাসায়নিকের উপস্থিতি পাখিদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।
-
দূষণ ও তীব্র তাপমাত্রা: বিশ্বের অন্যতম দূষিত বাতাস ও অতিরিক্ত ইট-পাথরের উত্তাপ মানুষের মতো পাখির শ্বাসতন্ত্র ও প্রজনন স্বাস্থ্যেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
-
মানুষের অসহনশীলতা: নগরায়নের নামে কৃত্রিম পরিচ্ছন্নতার দোহাই দিয়ে কাকের মতো কোলাহলপূর্ণ প্রাণীদের প্রতি সহনশীলতা দিন দিন কমছে। বাসা ভেঙে দেওয়া কিংবা তাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেবল পাখি নয়, ঐতিহ্য ও প্রতিবেশের ক্ষতি
পরিবেশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কাক কেবল বিরক্তিকর বা কোলাহলপূর্ণ পাখি নয়; এরা শহরের জৈব বর্জ্য পরিষ্কার ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এদের অনুপস্থিতি নির্দেশ করে ঢাকা শহর কীভাবে ধীরে ধীরে একটি “বাস্তুসংস্থানগত মরুভূমিতে” রূপ নিচ্ছে, যেখানে কেবল পরিকল্পনামাফিক ও কৃত্রিম জীবন ছাড়া অন্য কোনো প্রজাতি টিকে থাকতে পারছে না।
ঢাকার বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিনের নাগরিকরা স্মরণ করেন, একসময় সন্ধ্যায় হাজারও কাক একসঙ্গে নীড়ে ফিরত। কিন্তু সঠিক বৈজ্ঞানিক জরিপের অভাবে এই পতনের সঠিক পরিসংখ্যান নথিবদ্ধ হচ্ছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও আশঙ্কাজনক করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা যেমন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উড়ালসড়ক ও অট্টালিকায় রূপ নিচ্ছে, তেমনই নগরের প্রাকৃতিক প্রাণস্পন্দন হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবিদরা হুশিয়ারি দিয়ে বলছেন, কাকের মতো সহনশীল প্রাণীর এই অন্তর্ধান কেবল একটি পাখির বিদায় নয়—এটি আমাদের নগরের সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ের এক তীব্র অ্যালার্ম বেল।
