জহিরুল ইসলাম রাতুল: পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ত্যাগ, আত্মসমর্পণ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষায় সমৃদ্ধ এই উৎসবের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সামর্থ্যবান মুসলমানরা পশু কোরবানি করে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে মাংস বিতরণ করেন। কিন্তু সমাজের একটি বড় অংশ রয়েছে, যাদের কাছে ঈদের আনন্দ মানে কেবল একবেলা গরুর মাংস খাওয়ার সুযোগ।
খুলনা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে নিম্ন আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী, বয়স্ক ও অসহায় ব্যক্তিরা বিত্তবানদের বাড়ি, মসজিদ ও বিভিন্ন কোরবানি কেন্দ্রের আশপাশে ভিড় করছেন। তাদের অনেকের হাতে একটি ব্যাগ, কেউবা সন্তানকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন কিছু মাংস সংগ্রহের আশায়। সারা বছর গরুর মাংস কিনে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় এই একটি দিন তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
নগরীর এক শ্রমজীবী ব্যক্তি ২৭ বছর বয়সী নাজমুস সাকিব। প্রতিদিনের আয় দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতে হয় তাকে। ঈদের আগে বাজারে গরুর মাংসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ায় তা কেনার চিন্তাও করতে পারেন না তিনি।
নাজমুস সাকিব বলেন, “আমি দিনমজুর মানুষ। গায়ে-গতরে খেটে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসারের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। গরুর মাংস কিনে বউ-বাচ্চার মুখে তুলে দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। সারা বছর অপেক্ষা করি কোরবানির ঈদের জন্য। যারা কোরবানি দেয়, তাদের বাড়িতে গিয়ে একটু মাংস চাই। একজনের কাছ থেকে একটু, আরেকজনের কাছ থেকে একটু করে সংগ্রহ করতে পারলে অন্তত একবেলা পরিবারের সবাই ভালোভাবে খেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলেমেয়েরা যখন অন্যদের বাড়িতে মাংস রান্না হতে দেখে, তখন তারাও খেতে চায়। কিন্তু সব সময় তো আর তা সম্ভব হয় না। তাই কোরবানির ঈদ আমাদের মতো মানুষের জন্য বিশেষ আনন্দের দিন।”
একই ধরনের গল্প শোনা যায় ৫১ বছর বয়সী মাজেদুল ইসলামের মুখেও। জীবনের বেশিরভাগ সময় কঠোর পরিশ্রম করলেও বার্ধক্যের কারণে এখন আর নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। সংসারে আয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস না থাকায় বৃদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
মাজেদুল ইসলাম বলেন, “এক সময় কাজ করতাম, সংসার চালাতাম। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোই ছিলাম। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর ভেঙে গেছে। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। ছেলেমেয়েরাও খোঁজ নেয় না। বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ভিক্ষা করি। কোরবানির ঈদ এলে যারা কোরবানি দেয়, তাদের কাছে যাই। যদি একটু মাংস পাই, তাহলে বাড়ি নিয়ে গিয়ে দু’জনে রান্না করে খেতে পারি।”
কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, “আগে মানুষ অনেক বেশি সাহায্য করত। এখন অনেকে এক টুকরো মাংস দিতেও চায় না। অনেক বাড়িতে গিয়ে ফিরতে হয় খালি হাতে। তারপরও আশা নিয়ে বের হই, যদি কেউ দয়া করে কিছু দেয়।”
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির মাংস বিতরণের সময় অসহায় মানুষের দীর্ঘ সারি। কেউ রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কেউ আবার এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরছেন। তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে প্রত্যাশা, আবার অনেকের মধ্যে দেখা যায় হতাশার ছাপ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজের অনেক মানুষ এখনো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে কোরবানির ঈদে বিতরণ করা মাংস তাদের জন্য শুধু উৎসবের খাবার নয়, বরং পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসও বটে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে সম্পদ ও আনন্দ ভাগাভাগি করা। ইসলামে কোরবানির মাংসের একটি বড় অংশ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টনের নির্দেশনা রয়েছে, যাতে সমাজের প্রতিটি মানুষ ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারে।
সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, দয়া, উদারতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা গড়ে ওঠে। তাই কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি প্রকৃত অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
খুলনার বিভিন্ন এলাকার চিত্র যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। একদিকে কোরবানির উৎসবের আনন্দ, অন্যদিকে এক টুকরো মাংসের আশায় দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। তবুও তাদের প্রত্যাশা—সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো যদি একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে না কেউ।
ত্যাগ, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের এই মহোৎসব সকলের জীবনে সমান আনন্দ বয়ে আনুক—এমন প্রত্যাশাই অসহায় মানুষের। কোরবানির ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ, ধনী-গরিব নির্বিশেষে, ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারবে এবং কারও মুখে অভাবের কষ্টের ছাপ থাকবে না।
