ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » তামাক কোম্পানির নতুন ফাঁদ: নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

তামাক কোম্পানির নতুন ফাঁদ: নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

জহিরুল ইসলাম রাতুল: প্রতি চার সেকেন্ডে বিশ্বে তামাক ও তামাকজনিত রোগে অন্তত একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার হওয়ার ফলে প্রচলিত সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমলেও থেমে নেই তামাক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল। বরং নতুন প্রজন্মকে লক্ষ্য করে ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো এবং নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্যের মাধ্যমে তারা তৈরি করছে আসক্তির নতুন বাজার।

রোববার (৩১ মে) বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস-২০২৬’। এবারের প্রতিপাদ্য— “প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি: তামাক ও নিকোটিন আসক্তি প্রতিরোধ করি” (Unmasking the Appeal: Countering Nicotine and Tobacco Addiction)। দিবসটির মূল বার্তাই হলো তামাক কোম্পানিগুলোর নতুন বিপণন কৌশল ও প্রলোভনের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২০ বিলিয়নে। এই পতনের পরিপ্রেক্ষিতে তামাক কোম্পানিগুলো এখন নতুন বাজার খুঁজছে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে।

‘কম ক্ষতিকর’, ‘স্মোক-ফ্রি’ কিংবা ‘ধূমপান ছাড়ার সহায়ক’— এমন নানা প্রচারণার মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ই-সিগারেট, ভেপিং ডিভাইস, হিটেড টোব্যাকো এবং নিকোটিন পাউচকে আধুনিক জীবনধারা, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং ব্যক্তিগত স্টাইলের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববাজারে ১৬ হাজারেরও বেশি সুগন্ধিযুক্ত তামাক ও নিকোটিন পণ্য রয়েছে। বাবলগাম, চকলেট, চেরি, মিন্টসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় ফ্লেভারে তৈরি এসব পণ্য শিশু-কিশোরদের কাছে সহজেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। অনেক ই-সিগারেটকে ইউএসবি ড্রাইভ, কলম কিংবা খেলনার মতো দেখতে ডিজাইন করা হচ্ছে, যাতে এগুলো সহজে শনাক্ত করা না যায়।

বিশ্বব্যাপী অন্তত দেড় কোটি কিশোর-কিশোরী বর্তমানে নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিজ্ঞাপন ও ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে ব্যাপক প্রচারণা।

টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট নির্মাতার মাধ্যমে এসব পণ্যের প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি যেসব দেশে তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন আইনত নিষিদ্ধ, সেসব দেশেও তরুণদের বড় একটি অংশ নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-সিগারেটের প্রচারণা দেখতে পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে তামাক কোম্পানিগুলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে নিকোটিন পণ্যকে ‘ফ্যাশন’ এবং ‘সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা’র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

তামাক কোম্পানিগুলো ই-সিগারেট ও ভেপিংকে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে প্রচার করলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারের সঙ্গে ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, রক্তনালির ক্ষতি, দাঁত ও মাড়ির রোগ, ক্যান্সারের ঝুঁকি, মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা এবং উদ্বেগজনিত সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের পরবর্তীতে প্রচলিত সিগারেট ব্যবহারের ঝুঁকি প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরাই বর্তমানে ই-সিগারেটের প্রধান ভোক্তা, যাদের একটি বড় অংশ আগে কখনো ধূমপায়ী ছিল না।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করে। তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ অল্প বয়সেই শিশুদের একটি অংশ নিকোটিনের সংস্পর্শে আসছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা একই সময়ে তামাক খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আয়ের প্রায় দ্বিগুণ।

চলতি বছর জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’। সংশোধিত আইনে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা (ডিএসএ) বাতিল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ এবং বিক্রয়স্থলে তামাকপণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগ হলো, আইন সংশোধনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ই-সিগারেট, ভেপিং ও অন্যান্য নতুন প্রজন্মের নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধের বিধান বাদ পড়েছে। ফলে দেশে এসব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং সহজলভ্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো এখন আর শুধু সিগারেট বিক্রি করছে না; তারা পরিকল্পিতভাবে নতুন প্রজন্মকে নিকোটিনে আসক্ত করার জন্য নতুন নতুন পণ্য বাজারজাত করছে।

তার ভাষায়, “ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো এবং নিকোটিন পাউচকে আধুনিকতা, স্টাইল ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এগুলো শিশু-কিশোর ও তরুণদের নিকোটিন আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে অত্যন্ত কৌশলে এসব পণ্যের প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্যদিকে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, তরুণদের সুরক্ষায় ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ সব নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৮ শতাংশ তরুণ। তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষা করতে হলে নতুন আইনের দ্রুত বিধিমালা প্রণয়ন, ই-সিগারেট ও ভেপিংয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামাকপণ্যের প্রচারণা বন্ধ এবং তামাক কোম্পানির নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করতে হবে।

একই সঙ্গে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সব ধরনের তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর কর বৃদ্ধি করে সেগুলোকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়ারও সুপারিশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তামাক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী অগ্রগতি সত্ত্বেও তামাক কোম্পানিগুলো নতুন কৌশলে শিশু-কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। রঙিন মোড়ক, আকর্ষণীয় ফ্লেভার, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ‘নিরাপদ বিকল্প’-এর বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মাধ্যমে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন নিকোটিন-নির্ভর প্রজন্ম। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনের স্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর হবে এবং এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশের তরুণ প্রজন্মকে।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে