ঢাকা
ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » ৪০ মিনিটের পথ ৫ ঘণ্টায়: ঈদযাত্রায় সড়কের ওপর পশুর হাট

৪০ মিনিটের পথ ৫ ঘণ্টায়: ঈদযাত্রায় সড়কের ওপর পশুর হাট

৪০ মিনিটের পথ ৫ ঘণ্টায়: ঈদযাত্রায় সড়কের ওপর পশুর হাট

নিজস্ব প্রতিবেদ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়কের পাশে এবং আংশিক ওপরে বসানো হয়েছে কোরবানির পশুর হাট। এর ফলে মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট। আজ বিকেলে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চৌধুরী হাট এলাকায় দেখা গেছে এই নরকযন্ত্রণা।

‘গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে…’

চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন মোড় থেকে রাউজান যাওয়ার পথে আজ মঙ্গলবার বারবার মনে পড়ছিল বাউল শাহ আবদুল করিমের সেই বিখ্যাত গানের কলি—‘গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে’। স্বাভাবিক সময়ে বাসে এই ২৫ কিলোমিটারের মতো দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট। অথচ ঈদের ছুটিতে আজ সেই পথ পাড়ি দিতে সাধারণ যাত্রীদের জীবন থেকে কেটে গেল দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা। সময়ের এই অস্বাভাবিক ব্যবধান শুধু ঘড়ির কাঁটা দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। দুপুরের বৃষ্টির পর ভ্যাপসা গরমে বাসের ভেতর আটকে থাকা যাত্রীদের ক্লান্তি, অবুঝ শিশুদের কান্না আর বয়োবৃদ্ধদের অসহায়ত্বে প্রতিটি মুহূর্ত যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল।

নেপথ্যের কারণ: সড়ক দখল করে পশুর হাট ও আবহাওয়া

গন্তব্যে পৌঁছাতে এই পর্বতপ্রমাণ বাড়তি সময় লাগার মূল কারণ—মহাসড়কের পাশে ও ওপর নিয়মবহির্ভূতভাবে বসানো পশুর হাট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা এবং বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়া।

বৃষ্টির পর জনস্রোত: চট্টগ্রামে আজ সকাল থেকেই ছিল থেমে থেমে বৃষ্টি। কখনো ঝিরঝির, কখনো বা ভারী বর্ষণ। দুপুরের দিকে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হতেই ঘরমুখো মানুষ একযোগে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হতে শুরু করে।

উত্তর চট্টগ্রামের প্রধান প্রবেশদ্বার: চট্টগ্রাম উত্তরের তিন উপজেলা—হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি এবং পার্বত্য দুই জেলা—রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির লাখো বাসিন্দার যাতায়াতের প্রধান পথ নগরের ‘অক্সিজেন মোড়’। সবার মাঝে বাড়ি ফেরার তাড়া থাকায় সড়ক নিমেষেই লোকারণ্য হয়ে ওঠে।

রুট প্রোফাইল ও যানজটের কেন্দ্রবিন্দুসমূহ

বেলা আড়াইটায় অক্সিজেন মোড় থেকে বাস ছাড়ার পর আমানবাজার এলাকায় পৌঁছাতেই বদলে যায় চেনা দৃশ্যপট। যত দূর চোখ যায়—বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল আর রিকশার অন্তহীন সারি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গরু বোঝাই শত শত ছোট-বড় ট্রাক।

হাটের ভেতরে যখন চলছে উৎসবের আমেজ—ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, গরুর দাঁত দেখা, শিশুদের উচ্ছ্বাস; ঠিক তখনই জানালার ওপাশে সড়কের ওপর অপেক্ষা, ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাসের অন্য এক ধূসর ও বিপরীত ছবি।

ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ শিশু ও বৃদ্ধরা

দুপুরের বৃষ্টির পর ভ্যাপসা গরমে বাসের ভেতরের পরিবেশ হয়ে ওঠে অসহনীয়। জানালা খুললে বাইরের ধুলোবালি ও ধোঁয়া, আর বন্ধ করলে গরমে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এক শিশুকে দেখা গেল মায়ের কোলে একটানা কাঁদছে। মা কখনো হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন, কখনো পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন।

বাসে থাকা ফটিকছড়ির যাত্রী আবুল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “জরুরি কাজে শহরে গিয়েছিলাম। সড়কের এই নারকীয় অবস্থা জানলে আজ কোনোভাবেই বের হতাম না।”

সড়কে আটকে থাকা অবস্থায় যাত্রীদের ফোনে স্বজনদের কাছ থেকে বারবার কল আসছিল—‘আর কত দূর?’, ‘কখন পৌঁছাবে?’। কিন্তু কোনো যাত্রীর কাছেই এর সুনির্দিষ্ট উত্তর ছিল না। যানজটের তীব্রতা সইতে না পেরে অনেক স্বল্প দূরত্বের যাত্রী বাস থেকে নেমে মালামাল ও শিশু কোলে নিয়েই হাঁটা শুরু করেন।

ঈদযাত্রায় বাড়তি ভাড়ার নৈরাজ্য

ভোগান্তির এই মহাসড়কে বাসের চালক ও সহকারীরা মেতেছিল বাড়তি ভাড়া আদায়ের উৎসবে। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই প্রতিটি রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছিল:

রাউজান: ৭০ টাকা (স্বাভাবিক ভাড়া: ৬৫ টাকা)

গহিরা: ৬০ টাকা (স্বাভাবিক ভাড়া: ৫৫ টাকা)

হাটহাজারী: ৫০ টাকা (স্বাভাবিক ভাড়া: ৪০ টাকা)

বাধ্য হয়ে কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই যাত্রীরা এই বাড়তি ভাড়া মেনে নিলেও বিনিময়ে মিলেছে কেবল ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার চরম ভোগান্তি।

প্রশাসনের তোড়জোড় নেই, ক্ষুব্ধ যাত্রীরা

সব ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে বাস যখন রাউজানে পৌঁছায়, তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। অর্থাৎ, মাত্র ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লেগে গেল জীবনের মূল্যবান ৫টি ঘণ্টা!

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় ছিল, পুরো রাস্তায় যাত্রীদের এই চরম দুর্ভোগ লাঘবে কিংবা মহাসড়কের পশুর হাটগুলোর কারণে সৃষ্ট যানজট নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা হাইওয়ে পুলিশের কোনো কার্যকর ভূমিকা বা তোড়জোড় চোখে পড়েনি।

সচেতন মহলের বক্তব্য: ঈদের লম্বা ছুটিতে প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তটি আনন্দময় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিবছরই কেন পশুর হাটের নামে সড়ক বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে এই দুর্ভোগ পোহাতে হবে? কোরবানির পশুর হাট বসবে, মানুষ গরু কিনবে—এটিই উৎসবের নিয়ম। কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে