অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), সিবিএস নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর রাতে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউইয়র্কগামী ডেলটা এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর সেলমাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। উড়োজাহাজে এক বিমানকর্মীকে ঘুষি মারা, আরেকজনকে কামড় দেওয়া এবং আকাশে থাকা অবস্থায় দরজা খোলার চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
উড়োজাহাজে ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও সেলমা আক্রমণাত্মক আচরণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগপত্রে এক পুলিশ কর্মকর্তার বর্ণনা অনুযায়ী, স্ট্রেচারে সেলমাকে নিরাপদে রাখার সময় তিনি বাঁধন থেকে একটি পা বের করে ওই কর্মকর্তার মুখ, ঘাড় ও বুকে বারবার লাথি মারেন।
হাসপাতালে নেওয়ার পর এক নার্সকেও বুকে লাথি মারার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
১২ অক্টোবর আদালতে হাজির হলে সেলমার আইনজীবী শন বার্নস তার পক্ষে অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিচারক নগদ ২০ হাজার ডলার অথবা ৬০ হাজার ডলারের বন্ডে জামিনের অঙ্ক নির্ধারণ করেন। আগামী জানুয়ারিতে পরবর্তী শুনানির তারিখ রাখা হয়েছে।
এদিকে উড়োজাহাজের ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে পৃথক ফেডারেল আইনি প্রক্রিয়াও চলছে।
উড়োজাহাজে কী ঘটেছিল?
ডেলটা এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩৮ লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউইয়র্ক যাচ্ছিল। উড়োজাহাজটি জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর রাত ১১টার দিকে এক যাত্রীর আক্রমণাত্মক আচরণের খবর পান কর্তৃপক্ষ। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষের পুলিশ সদস্যরা উড়োজাহাজের কাছে যান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনায় দুজন বিমানকর্মী আহত হওয়ার কথা জানান। তাদের একজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। উড়োজাহাজের পাইলটের সঙ্গে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিংয়েও আহত ব্যক্তিদের কথা উঠে এসেছে। সেখানে নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও কামড়ের দাগের উল্লেখ করেন পাইলট। আহত ব্যক্তিদের পরীক্ষা করার জন্য বিমানবন্দরে চিকিৎসাকর্মী প্রস্তুত রাখার অনুরোধও জানান তিনি।
সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, উড়োজাহাজের কর্মীদের সেলমাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছিল। তবে ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আইনজীবীর দাবি, ওষুধ বাদ পড়ায় বিভ্রান্ত হয়েছিলেন অভিনেত্রী
সেলমার আইনজীবীর দাবি, তার মক্কেলের আচরণ ইচ্ছাকৃত ছিল না। নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনের বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সেলমা এমন একটি ওষুধের একাধিক নির্ধারিত মাত্রা নিতে পারেননি, যা তার গুরুতর স্নায়বিক উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, লস অ্যাঞ্জেলেসে কাজের অতিরিক্ত চাপের পর উড়োজাহাজে উঠেছিলেন সেলমা। যাত্রাপথে তার মাথায়ও আঘাত লাগে বলে দাবি করা হয়েছে। ওষুধের মাত্রা বাদ পড়া, মাথায় আঘাত এবং উড়োজাহাজের উচ্চতার প্রভাব মিলিয়ে তিনি তীব্র বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিলেন বলে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়।
সেলমার প্রতিনিধিও এর আগে ভ্যারাইটিকে জানিয়েছিলেন, তার শারীরিক জরুরি অবস্থার কারণেই কথিত ঘটনাগুলো ঘটেছিল। অবতরণের পরপরই তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তখন তার অবস্থা স্থিতিশীল ছিল বলেও জানানো হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত
সেলমার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনার মধ্যে সামনে এসেছে তার দীর্ঘদিনের অসুস্থতার বিষয়টিও। ২০১৮ সালে অভিনেত্রী জানান, তিনি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে (এমএস) আক্রান্ত। এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি একটি রোগ, যা মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডের স্নায়ুকে প্রভাবিত করতে পারে।
রোগটির কথা প্রকাশ্যে জানানোর পর থেকে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন সেলমা। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক আইন প্রণয়নের বার্ষিকী উপলক্ষে হোয়াইট হাউসের একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়।
এর আগেও উড়োজাহাজে অস্বাভাবিক আচরণের ঘটনা
উড়োজাহাজে এমন পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সেলমার জীবনে এই প্রথম নয়। ২০১৬ সালে মেক্সিকোর কানকুন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসগামী একটি ফ্লাইটে ভ্রমণের সময়ও অস্বাভাবিক আচরণ করেছিলেন তিনি। সে সময় তাকে স্ট্রেচারে করে উড়োজাহাজ থেকে নামানো হয়। ওই যাত্রায় তার সঙ্গে ছিল চার বছর বয়সী ছেলে।
পরে সেলমা জানিয়েছিলেন, এক গ্লাস ওয়াইন পান করার পর ওষুধ খাওয়ায় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। নিজের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি ওই অভিজ্ঞতাকে ভয়াবহ ও আতঙ্কজনক বলে বর্ণনা করেছিলেন। একজন মা হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে পড়া তার নিজের কাছেও অস্বাভাবিক ছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন অভিনেত্রী।
১৯৯৯ সালের চলচ্চিত্র ‘ক্রুয়েল ইনটেনশনস’ এবং ২০০১ সালের ‘লিগ্যালি ব্লন্ড’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পান সেলমা ব্লেয়ার। পরে ২০০৪ সালের ‘হেলবয়’ ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
