উত্তর আমেরিকায় ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মহাযজ্ঞ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ২৬ দিন। কাউন্টডাউন যত ঘনিয়ে আসছে, ফুটবলপ্রেমীদের মনে তত উঁকি দিচ্ছে অতীতের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি। যার মধ্যে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি মঞ্চস্থ হয়েছিল আজ থেকে চার বছর আগে, কাতার বিশ্বকাপের লুসাইল স্টেডিয়ামে। যেখানে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বজয়ের এক অনন্য রূপকথা লিখেছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।
২০২২ সালের ২২ নভেম্বর—দিনটি আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের জন্য ছিল এক চরম ধাক্কার। টানা ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থেকে হট ফেভারিট হিসেবে কাতারে পা রেখেছিল আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ ছিল র্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা সৌদি আরব। ম্যাচের ১০ মিনিটে লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলে লিড নিয়ে প্রথমার্ধেই ম্যাচ নিজেদের পকেটে পুরে ফেলেছিল আর্জেন্টিনা। অফসাইডের কারণে বাতিল হয়েছিল আরও ৩টি গোল। কিন্তু বিরতির পর যা ঘটেছিল, তা ফুটবল বিশ্ব কল্পনাই করতে পারেনি।
৫ মিনিটের সেই অবিশ্বাস্য ঝড়
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই চিত্রনাট্য বদলে দেয় সৌদি আরব। ৪৮ মিনিটে সালেহ আল-শেহরির দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফেরে তারা। এর ঠিক ৫ মিনিট পর, ৫৩ মিনিটে সালেম আল-দাওসারির একক নৈপুণ্যে করা এক জাদুকরী কার্লিং শট পরাস্ত করে আর্জেন্টিনার বাজপাখি খ্যাত গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে। পুরো লুসাইল স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। ম্যাচের বাকি সময়ে আর্জেন্টিনা ১৫টি শট নিলেও সৌদি গোলরক্ষক মোহাম্মদ আল-ওয়েইসের চীনের প্রাচীরসম রক্ষণ ভেদ করতে পারেনি। ২-১ গোলের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সৌদি আরব।

ধাক্কা সামলে বিশ্বজয়ের রূপকথা
প্রথম ম্যাচেই এই অভাবনীয় পরাজয় আর্জেন্টিনার ওপর পাহাড়সম চাপ তৈরি করেছিল। নকআউট পর্বে যেতে হলে মেক্সিকোর বিপক্ষে পরের ম্যাচটি জেতা ছাড়া কোনো পথ খোলা ছিল না স্কালোনির শিষ্যদের। তবে এই পরাজয়ই যেন দলটিকে পুনর্জন্ম দেয়। ধাক্কা সামলে মেক্সিকো ও পোল্যান্ডকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই পরের রাউন্ডে যায় আর্জেন্টিনা।
এরপর শেষ ষোলোতে অস্ট্রেলিয়াকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে লড়াকু জয়, সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া এবং সবশেষে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল জিতে ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুকুট মাথায় তোলেন লিওনেল মেসি।
সৌদি আরবের ঐতিহাসিক কীর্তি: এটি ছিল বিশ্বকাপে সৌদি আরবের ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ জয়। যদিও পরের দুই ম্যাচে পোল্যান্ড ও মেক্সিকোর কাছে হেরে তারা গ্রুপ পর্বের তলানিতে থেকে বিদায় নিয়েছিল, কিন্তু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই জয়টি তাদের ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লুসাইল কানেকশন: কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালসহ মোট ৫টি ম্যাচ আর্জেন্টিনা এই লুসাইল স্টেডিয়ামেই খেলেছিল। প্রথম ম্যাচে এই মাঠ তাদের কান্না উপহার দিলেও, শেষ ম্যাচে এই মাঠেই মেসি উঁচিয়ে ধরেছিলেন তাঁর স্বপ্নের সোনালী ট্রফি।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপট: এবারের বর্ধিত ৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ থেকেই দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ কাতার বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক ফুটবলে ‘ছোট দল’ বলে কিছু নেই।
আপনার কি মনে হয় প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে এই অপ্রত্যাশিত হারই কি আর্জেন্টিনাকে অতি-আত্মবিশ্বাসের ফাঁদ থেকে বাঁচিয়ে ট্রফি জয়ের জন্য বেশি ক্ষুধার্ত করে তুলেছিল?
এসডি
