ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » আজ বিশ্ব যুবদিবস

আজ বিশ্ব যুবদিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: আজ ১২ আগস্ট, আন্তর্জাতিক যুব দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। তরুণদের সম্ভাবনা, অধিকার, অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করতেই প্রতিবছর এ দিনটি আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে পালন করা হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৯ সালে ১২ আগস্টকে আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সাল থেকে দিবসটির আনুষ্ঠানিক পালন শুরু হয়।

এবারের আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্য—“ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা” (Different Contexts, Common Aspirations) । জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা আলাদা হলেও তাদের মৌলিক আকাঙ্ক্ষার জায়গাগুলো অনেকটাই অভিন্ন। মানসম্মত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান, সুস্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ—বিশ্বজুড়ে তরুণদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা।

ভিন্ন বাস্তবতা, একই স্বপ্ন

একুশ শতকের তরুণ প্রজন্ম এমন এক সময়ে বেড়ে উঠছে, যখন প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন তাদের সামনে অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ধরনের বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন শিক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে ইন্টারনেট সুবিধার অসম বণ্টন, দক্ষতার ঘাটতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য অনেক তরুণকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতপ্রবণ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণদের বাস্তবতা আরও কঠিন। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য এবং ডিজিটাল বিভাজনের মধ্যেও তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা করছে। জাতিসংঘও বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা একই সঙ্গে জলবায়ু আন্দোলন, সামাজিক উদ্যোগ, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও কমিউনিটি উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশের তরুণরা সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলছে

জনসংখ্যার দিক থেকে তরুণদের বড় অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় সম্ভাবনা, তেমনি এটি একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জও। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী তরুণ—যাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারলে তারা অর্থনীতি ও সমাজের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের তরুণদের একটি অংশ ইতোমধ্যে প্রচলিত কর্মসংস্থানের বাইরে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, কনটেন্ট নির্মাণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

বিশেষ করে অনলাইন শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষণাভিত্তিক তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন শ্রম সরবরাহকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি গবেষণা প্রতিবেদনেও দেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন শ্রম সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে দেশের তরুণদের কাছে ফ্রিল্যান্সিং শুধু বাড়তি আয়ের মাধ্যম নয়, বরং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে সরাসরি অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে। তবে দক্ষতার মান, ইংরেজি ও যোগাযোগ দক্ষতা, উচ্চগতির ইন্টারনেট, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা—এসব ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

কর্মসংস্থানই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—শিক্ষা শেষ করার পর তারা কোথায় কাজ করবে?

প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য, বাস্তবমুখী দক্ষতার ঘাটতি এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তা তরুণদের কর্মসংস্থানে বাধা সৃষ্টি করছে।

ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ চাকরির পেছনে দীর্ঘ সময় ছুটছেন, কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন কাজের মাধ্যমে বিকল্প কর্মজীবন বেছে নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য শুধু একাডেমিক সনদ নয়; প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ডিজিটাল বিভাজনও বড় বাধা

প্রযুক্তির যুগে সুযোগের একটি বড় অংশ এখন অনলাইননির্ভর। কিন্তু দেশের সব তরুণের হাতে সমান মানের ডিভাইস, ইন্টারনেট ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল অবকাঠামোর পার্থক্যও তরুণদের সম্ভাবনা বিকাশে প্রভাব ফেলছে।

একদিকে ঢাকার মতো বড় শহরের তরুণরা তুলনামূলকভাবে সহজে প্রশিক্ষণ, উচ্চগতির ইন্টারনেট, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারছেন। অন্যদিকে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক তরুণ এখনো নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রয়োজনীয় ডিভাইস ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত।

এই বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন সাশ্রয়ী ডিভাইস, মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতেও তরুণদের লড়াই

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। উপকূলীয় অঞ্চল, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও বন্যার মতো দুর্যোগ তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলে।

তবে সংকটের শিকার হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণদের একটি অংশ জলবায়ু আন্দোলন ও পরিবেশ রক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিকবিরোধী প্রচারণা, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সোচ্চার হচ্ছে।

জাতিসংঘের এবারের যুব দিবসের আলোচনায়ও জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও মানসিক সুস্থতাকে তরুণদের অভিন্ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষাগত চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক সংকট, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ—সব মিলিয়ে তরুণদের মানসিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক যুববিষয়ক আলোচনাতেও বেকারত্ব, দারিদ্র্য, জলবায়ু-উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে তরুণদের মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

তাই যুব উন্নয়ন নীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

তরুণদের জন্য বিনিয়োগই ভবিষ্যতের বিনিয়োগ

আন্তর্জাতিক যুব দিবস শুধু তরুণদের সাফল্য উদযাপনের দিন নয়; এটি তাদের অধিকার ও সম্ভাবনা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, উদ্যোক্তা সহায়তা বাড়ানো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বৈষম্য কমানো, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো—এসব এখন সময়ের দাবি।

জাতিসংঘের ২০২৬ সালের যুব দিবসের বার্তায়ও তরুণদের নীতিনির্ধারণে অর্থবহ অংশগ্রহণ এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব নীতিতে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণরা ইতোমধ্যে প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, সামাজিক উদ্যোগ, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও নাগরিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এখন প্রয়োজন তাদের সম্ভাবনাকে টেকসইভাবে কাজে লাগানোর জন্য রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ।

ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা যতই ভিন্ন হোক, বিশ্বের তরুণদের স্বপ্নে রয়েছে মর্যাদা, সুযোগ, নিরাপত্তা ও একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ। সেই অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবতায় রূপ দিতে পারলেই এবারের যুব দিবসের প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লো

গান না হয়ে উঠবে বৈষম্যহীন ও টেকসই পৃথিবী গড়ার বাস্তব অঙ্গীকার।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে