জহিরুল ইসলাম রাতুল: বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বদলে যায় বাংলাদেশের চেনা দৃশ্যপট। অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই শুরু হয় ফুটবল উন্মাদনা। চার বছর পরপর আয়োজিত এই মহাযজ্ঞকে ঘিরে দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর আবেগ যেন নতুন করে জেগে ওঠে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাঝে এ উন্মাদনা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কেউ প্রিয় দলের জার্সি পরে রাস্তায় ঘোরে, কেউ মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বের করে, আবার কেউ বিশাল আকৃতির পতাকা টাঙিয়ে নিজেদের সমর্থনের জানান দেয়।
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ উপলক্ষে ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, জার্মানি ও ফ্রান্স সহ পছন্দের দলের বিশাল বিশাল পতাকা। কোথাও কয়েকতলা ভবনের সমান পতাকা, কোথাও পুরো রাস্তা জুড়ে রঙিন কাপড়ের ব্যানার।
ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগের এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তৈরি করছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি হয় বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বিদ্যুতের তারের আশপাশে পতাকা টাঙানোর সময়। কিশোররা সাধারণত কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই বাঁশের মই ব্যবহার করে খুঁটিতে উঠে পড়ে। অনেক সময় বিদ্যুতের তার কতটা বিপজ্জনক, সে সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণাও থাকে না।
বিশাল পতাকা টাঙানোর সময় কাপড় বাতাসে উড়ে গিয়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে যেতে পারে। এতে শর্ট সার্কিট, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া কিংবা আগুন লাগার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে বৃষ্টি বা ঝড়ো আবহাওয়ায় ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা প্রায়ই সতর্ক করে বলেন, উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের কাছাকাছি যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি তার স্পর্শ না করলেও বিদ্যুতের আর্ক বা তড়িৎ প্রবাহের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। কোথাও পতাকা টাঙাতে গিয়ে কিশোর আহত হয়, কোথাও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। কেউ ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যায়, কেউ আবার বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়।
ফায়ার সার্ভিস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক সময় রাস্তার ওপর বিশাল পতাকা টাঙানোর কারণে যানবাহন চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়। বাতাসে পতাকা ছিঁড়ে মোটরসাইকেল আরোহীর গায়ে জড়িয়ে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবেও পতাকা উন্মাদনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। কে কত বড় পতাকা টাঙাতে পারে, কার এলাকার সাজসজ্জা বেশি আকর্ষণীয়—এ নিয়ে এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
অনেক কিশোর রাতভর কাজ করে বড় বড় পতাকা তৈরি করে। পরে সেটি টাঙাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয়। অনেকেই ফেসবুক বা টিকটকের জন্য ভিডিও করতে গিয়ে আরও বিপজ্জনকভাবে বৈদ্যুতিক খুঁটি বা ভবনের কার্নিশে উঠে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কৈশোর বয়সে আবেগ বেশি কাজ করে। তাই তারা ঝুঁকিকে গুরুত্ব না দিয়ে সাহসিকতা দেখাতে চায়। কিন্তু সামান্য অসাবধানতাই একটি পরিবারকে আজীবনের কান্নায় ভাসিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সচেতনতার অভাবই বড় দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেকেই মনে করেন, কয়েক মিনিটের জন্য খুঁটিতে উঠলে কিছু হবে না। কিন্তু বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এক সেকেন্ডের ভুলও ভয়াবহ হতে পারে।
অন্যদিকে, স্থানীয়ভাবে বড় পতাকা টাঙানোর ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। ফলে কিশোররা নিজেরাই ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ করে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের আনন্দ উপভোগ করতে হলে কিছু বিষয়ে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে—
*বৈদ্যুতিক খুঁটি বা বিদ্যুতের তারের পাশে পতাকা টাঙানো যাবে না।
* শিশু ও কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উঠতে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
* বড় পতাকা টাঙানোর আগে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
* ঝড়-বৃষ্টি বা ভেজা আবহাওয়ায় পতাকা টাঙানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
* রাস্তার ওপর এমনভাবে পতাকা লাগানো যাবে না যাতে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়।
* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার জন্য বিপজ্জনক স্টান্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। পাড়ায়-মহল্লায় কিশোরদের নিরাপদভাবে উৎসব উদযাপনে উৎসাহিত করতে হবে।
বিশ্বকাপ ফুটবল মানুষের আনন্দের উৎস। এই আনন্দ যেন কোনো দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর খবরে পরিণত না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রিয় দলের পতাকা উড়ুক, ফুটবল উন্মাদনায় মাতুক দেশ এমনটাই সবার প্রত্যাশা তবে সবার আগে নিশ্চিত হোক নিরাপত্তা, সচেতনতা ও মানবিক দায়িত্ববোধ।
