ঢাকা
ঢাকা, সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » Why Nations Fail’ 

Why Nations Fail’ 

আমিরুল ইসলাম কাগজীঃ
‘Why Nations Fail: The Origins of Power, Prosperity, and Poverty’ গ্রন্থটি অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু (Daron Acemoglu) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস এ. রবিনসন (James A. Robinson)-এর একটি বিখ্যাত রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ক বই। বইটি ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়।
গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
কেন পৃথিবীর কিছু দেশ সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও উন্নত হয়, আর কিছু দেশ দারিদ্র্য, বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতির মধ্যে আটকে থাকে?
লেখকদের উত্তর হলো—কোনো দেশের ভূগোল, সংস্কৃতি বা জনগণের চরিত্র একা তার ভাগ্য নির্ধারণ করে না; বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানই একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রধান নির্ধারক।
১. বইটির কেন্দ্রীয় তত্ত্ব: প্রতিষ্ঠানই মূল
অ্যাসেমোগ্লু ও রবিনসনের মতে, একটি দেশের উন্নয়নের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Institutions বা প্রতিষ্ঠান।
তারা প্রতিষ্ঠানকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেছেন—
১. Inclusive Institutions — অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান
যেসব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।
যেমন—
আইনের শাসন
সম্পত্তির অধিকার
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা
রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ
ন্যায্য প্রতিযোগিতা
ব্যবসা ও বিনিয়োগের স্বাধীনতা
শিক্ষা ও সুযোগের বিস্তার
ক্ষমতার জবাবদিহি
নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুযোগ
এ ধরনের ব্যবস্থায় মানুষ জানে যে তার পরিশ্রমের ফল অন্য কেউ ইচ্ছামতো কেড়ে নিতে পারবে না। ফলে মানুষ বিনিয়োগ করে, ব্যবসা করে, নতুন ধারণা তৈরি করে এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়।
২. Extractive Institutions — শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান
অন্যদিকে Extractive Institutions হলো এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে একটি ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠী রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও সুযোগ নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করে।
এখানে সাধারণত দেখা যায়—
ক্ষমতা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত
রাজনৈতিক বিরোধিতার সুযোগ সীমিত
সম্পদের অসম বণ্টন
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি
আইনের অসম প্রয়োগ
একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ
সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত
প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করে
এ ধরনের রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনো কখনো হতে পারে, কিন্তু তা সাধারণত টেকসই ও ব্যাপকভিত্তিক হয় না।
৩. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আগে, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরে
বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্র নির্ধারণ করে।
যদি কোনো দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে সেই ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সাধারণত নিজেদের স্বার্থে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানও নিয়ন্ত্রণ করবে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, একজন শাসক যদি বিচারব্যবস্থা, সংসদ, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা কাঠামোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাহলে তিনি অর্থনীতিতেও নিজের অনুগতদের সুবিধা দিতে পারেন।
ফলে সৃষ্টি হয় একটি চক্র—
রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ → অর্থনৈতিক সুযোগের কেন্দ্রীকরণ → সম্পদের কেন্দ্রীকরণ → আরও রাজনৈতিক ক্ষমতা → আরও শোষণ।
অ্যাসেমোগ্লু ও রবিনসনের মতে, এটাই অনেক ব্যর্থ রাষ্ট্রের মূল সমস্যা।
৪. ‘গরিব দেশ মানেই খারাপ ভূগোল’—এই ধারণার বিরোধিতা
প্রচলিত কিছু তত্ত্ব মনে করে, কোনো দেশ দরিদ্র হওয়ার কারণ তার—
প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থান,
উষ্ণ আবহাওয়া,
অনুর্বর মাটি,
রোগব্যাধি,
প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব।
লেখকরা বলেন, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু এগুলো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়।
এর অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ হলো উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া।
দুই কোরিয়ার জনগণের—
ভাষা একই,
ঐতিহাসিক ঐতিহ্য একই,
সংস্কৃতি একই,
ভৌগোলিক পরিবেশও কাছাকাছি।
কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে গিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলকভাবে বাজার, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। উত্তর কোরিয়ায় কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অত্যন্ত সীমিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ফলাফলও বিপরীত।
অতএব, একই জনগোষ্ঠী ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ফলাফল পেতে পারে।
৫. সংস্কৃতিই কি উন্নয়নের প্রধান কারণ?
আরেকটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো—কিছু জাতি নাকি সাংস্কৃতিকভাবে বেশি পরিশ্রমী, শৃঙ্খলাবদ্ধ বা উদ্যোগী; অন্যরা নয়।
লেখকরা এই ব্যাখ্যাকেও অসম্পূর্ণ মনে করেন।
তাদের যুক্তি হলো, একই ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মানুষ ভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে ভিন্ন ফলাফল অর্জন করতে পারে।
অর্থাৎ—
সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানও সংস্কৃতি ও মানুষের আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
৬. ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’ কেন সবসময় আশীর্বাদ নয়?
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Resource Curse বা সম্পদ-অভিশাপ।
কোনো দেশের বিপুল তেল, গ্যাস বা খনিজ সম্পদ থাকলেই যে দেশটি সমৃদ্ধ হবে—এমন নয়।
কারণ যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শোষণমূলক হয়, তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ—
জনগণের উন্নয়নে না গিয়ে
ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর হাতে যেতে পারে,
দুর্নীতি বাড়াতে পারে,
রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই বাড়াতে পারে,
অর্থনীতিকে একক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল করতে পারে।
অর্থাৎ সম্পদ কতটা আছে তার চেয়ে সম্পদ কে কীভাবে ব্যবহার করছে—সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৭. ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন করে ‘Critical Juncture’
বইটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো Critical Juncture বা ইতিহাসের সংকটময় সন্ধিক্ষণ।
কোনো বড় ঘটনা—যেমন—
যুদ্ধ,
বিপ্লব,
মহামারি,
রাজনৈতিক সংকট,
ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান,
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
একটি দেশের প্রতিষ্ঠানকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে।
এই মুহূর্তে কোন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতা দখল করছে এবং কী ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে—তার ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করতে পারে।
৮. ‘Virtuous Cycle’ বা সাফল্যের চক্র
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান নিজেদের আরও শক্তিশালী করতে পারে।
একটি দেশে যদি—
আইনের শাসন → রাজনৈতিক অংশগ্রহণ → অর্থনৈতিক সুযোগ → উদ্যোক্তা সৃষ্টি → বিনিয়োগ → প্রবৃদ্ধি → মধ্যবিত্তের বিকাশ → আরও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
এভাবে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়, তাহলে একটি Virtuous Cycle বা ইতিবাচক চক্র গড়ে ওঠে।
এর ফলে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হয়।
৯. ‘Vicious Cycle’ বা ব্যর্থতার চক্র
শোষণমূলক প্রতিষ্ঠানও নিজেদের টিকিয়ে রাখে।
যেমন—
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ → সম্পদ দখল → দুর্নীতি → বিরোধীদের দমন → আরও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ → আরও সম্পদ দখল।
এটি হলো Vicious Cycle বা নেতিবাচক চক্র।
এখানে ক্ষমতাসীনরা প্রতিষ্ঠান সংস্কার করতে চায় না, কারণ বর্তমান ব্যবস্থা তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুবিধা দেয়।
১০. তবে শোষণমূলক রাষ্ট্রও কি অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারে?
এখানে বইটির একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে।
লেখকরা বলেন, Extractive Institutions-এর অধীনেও সাময়িকভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে।
কারণ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র—
বিপুল অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে,
শ্রমিকদের সংগঠিত করতে পারে,
দ্রুত শিল্পায়ন করতে পারে,
বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই প্রবৃদ্ধি সাধারণত উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর করতে পারে না।
কারণ নতুন প্রযুক্তি ও নতুন ব্যবসা পুরনো ক্ষমতাবানদের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তাই শোষণমূলক ব্যবস্থা অনেক সময় উন্নয়নের একটি পর্যায় তৈরি করতে পারে, কিন্তু টেকসই সমৃদ্ধি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়।
১১. সৃজনশীল ধ্বংস—Creative Destruction
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Creative Destruction।
অর্থনীতিতে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন ব্যবসা পুরনো প্রযুক্তি ও ব্যবসাকে প্রতিস্থাপন করে।
যেমন—
মুদ্রণযন্ত্র → পুরনো পদ্ধতির পরিবর্তন
অটোমোবাইল → ঘোড়ার গাড়ির পরিবর্তন
কম্পিউটার → বহু পুরনো প্রযুক্তির পরিবর্তন
ইন্টারনেট → প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামোর পরিবর্তন
কিন্তু নতুনত্ব পুরনো ক্ষমতাবানদের স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
তাই শোষণমূলক শাসকরা অনেক সময় নতুন প্রযুক্তি বা রাজনৈতিক পরিবর্তন বাধাগ্রস্ত করে।
অন্যদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান নতুনত্বকে উৎসাহিত করে।
১২. ইংল্যান্ডের উদাহরণ
লেখকরা ইংল্যান্ডের Glorious Revolution (১৬৮৮)-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখেছেন।
এর পর ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ, সম্পত্তির অধিকারের নিরাপত্তা এবং সংসদের ভূমিকা বৃদ্ধি পায়।
এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
পরবর্তীকালে শিল্পবিপ্লবের জন্য যে—
উদ্ভাবন,
বিনিয়োগ,
উদ্যোক্তা,
প্রযুক্তিগত পরিবর্তন
প্রয়োজন ছিল, তার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৩. কেন একই নীতি এক দেশে কাজ করে, অন্য দেশে করে না?
বইটির একটি গভীর শিক্ষা হলো—কোনো উন্নয়ন মডেল কেবল নকল করলেই সফল হওয়া যায় না।
একটি দেশের প্রতিষ্ঠান, ইতিহাস, ক্ষমতার কাঠামো এবং রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করতে হয়।
কারণ কোনো দেশে কার্যকর একটি অর্থনৈতিক নীতি অন্য দেশে ব্যর্থ হতে পারে, যদি সেখানে—
রাজনৈতিক জবাবদিহি না থাকে,
সম্পত্তির অধিকার নিরাপদ না থাকে,
দুর্নীতি ব্যাপক হয়,
ক্ষমতা অল্প কয়েকজনের হাতে থাকে।
১৪. বইটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা
‘Why Nations Fail’ আসলে শুধু অর্থনীতির বই নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও মানুষের অর্থনৈতিক আচরণের সম্পর্ক নিয়ে একটি বিশ্লেষণ।
লেখকদের মূল বক্তব্যকে একটি সূত্রে প্রকাশ করলে দাঁড়ায়—
দরিদ্রতা মানুষের ভাগ্য নয়; খারাপ প্রতিষ্ঠান দরিদ্রতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
একটি জাতি সমৃদ্ধ হতে চাইলে শুধু রাস্তা, সেতু, শিল্পকারখানা বা বিদেশি বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। দরকার এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করবে—
“আমি পরিশ্রম করলে, বিনিয়োগ করলে, নতুন কিছু সৃষ্টি করলে তার সুফল আমি পাব এবং রাষ্ট্র অন্যায়ভাবে তা কেড়ে নেবে না।”
১৫. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বইটির শিক্ষা
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বইটির তত্ত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিচার করতে গেলে শুধু GDP বৃদ্ধি দেখলে হবে না। দেখতে হবে—
আইনের শাসন কতটা কার্যকর,
দুর্নীতি কতটা নিয়ন্ত্রিত,
ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা কতটা ন্যায্য,
সম্পত্তির অধিকার কতটা নিরাপদ,
প্রশাসন কতটা জবাবদিহিমূলক,
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কতটা অংশগ্রহণমূলক,
শিক্ষা ও সুযোগ কতটা বিস্তৃত,
উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ কেমন।
কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান এক জিনিস নয়।
কোনো দেশে দ্রুত GDP বৃদ্ধি হতে পারে, কিন্তু যদি সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমাগত একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।
উপসংহার
‘Why Nations Fail’-এর মূল প্রশ্ন হলো—কেন কিছু জাতি সমৃদ্ধ হয় আর কিছু জাতি দরিদ্র থেকে যায়?
অ্যাসেমোগ্লু ও রবিনসনের উত্তর হলো, এর কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠান।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান → অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান → বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন → ব্যাপক অর্থনৈতিক সুযোগ → দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি।
অন্যদিকে—
শোষণমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান → শোষণমূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান → সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ → বৈষম্য ও অদক্ষতা → রাজনৈতিক সংঘাত → দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য।
সুতরাং একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল তার প্রাকৃতিক সম্পদ, ভূগোল, সংস্কৃতি বা জনগণের মেধার ওপর নির্ভর করে না। কী ধরনের প্রতিষ্ঠান সেই জনগণকে পরিচালনা করছে—সেটিই অনেকাংশে নির্ধারণ করে জাতিটি সফল হবে, নাকি ব্যর্থ হবে।
এই কারণেই ‘Why Nations Fail’ আধুনিক রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ—এটি আমাদের শেখায় যে কোনো দেশের উন্নয়নের প্রকৃত প্রশ্ন শুধু “কতটা উন্নয়ন হয়েছে?” নয়; বরং “কার জন্য উন্নয়ন, কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এবং কোন প্রতিষ্ঠান সেই উন্নয়নকে পরিচালনা করছে?”

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে