রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ওআইএসস
নিজস্ব প্রতিবেদক,পাবনা: বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে যুক্ত হলো রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ‘অপারেটর ইনফরমেশন সাপোর্ট সিস্টেম’ (OISS)। বর্তমানে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ এর কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক চালুর প্রক্রিয়া চলছে। এই ইউনিটের ইন্সট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (I&C) সিস্টেমে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘রোসাটম অটোমেটেড কন্ট্রোল সিস্টেমস’ (RASU) অত্যন্ত সফলতার সাথে এই ‘স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ ব্যবস্থাটি যুক্ত করেছে।
গত মঙ্গলবার (২৬ মে) নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (NPCBL)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান গণমাধ্যমকে এই আধুনিক ডিজিটাল সহায়তা ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ওআইএসএস (OISS) বা ‘স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ কী?
এই ওআইএসএস ব্যবস্থাটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে প্রতিনিয়ত সচল থাকা হাজার হাজার অপারেশনাল প্যারামিটার বা কার্যক্রমের রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) পর্যবেক্ষণ এবং নিখুঁত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
এর প্রধান কাজ ও সুবিধাগুলো হলো:
তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ: রিয়েল-টাইমে পাওয়ার ইউনিটের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা।
সহজ ভিজ্যুয়ালাইজেশন: জটিল সব তথ্যকে অপারেটরদের সামনে সহজ ও দৃশ্যমান আকারে উপস্থাপন করা।
দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ: যেকোনো জরুরি মুহূর্তে অপারেটরদের সঠিক ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বুদ্ধিমান সহকারী হিসেবে সাহায্য করা।
দক্ষতা বৃদ্ধি: বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনগত দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন
আরএএসইউ (RASU)-এর সিইও আন্দ্রেই বুটকো এই যুগান্তকারী প্রযুক্তি প্রসঙ্গে বলেন:
“তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাকে আরও সহজতর করে এবং অপারেটরের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার মাধ্যমে এই সিস্টেমটি পরিচালনগত দক্ষতা ও নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এর সফল বাস্তবায়ন বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পগুলোতে উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে রোসাটমের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যতের জন্য এই বিশেষ উদ্যোগটির অপরিসীম গুরুত্ব তুলে ধরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন বলেন:
“রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক প্রকল্প। এখানে ব্যবহৃত আধুনিক রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির পাশাপাশি ওআইএসএস-এর মতো বিশ্বমানের উন্নত ডিজিটাল সমাধানের সংযোজন একটি শক্তিশালী পরিচালন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা রাখবে।”
প্রযুক্তির ইতিহাস ও রূপপুরের সক্ষমতা
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই ওআইএসএস প্রযুক্তিটি সর্বপ্রথম রাশিয়ার নিজস্ব ‘নোভোভোরোনেঝ’ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্পূর্ণ পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর দেশটির অন্যতম আধুনিক ও উন্নত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘কুর্স্ক এনপিপি-২’-এ এটি সফলভাবে চালু করা হয়। আর রাশিয়ার বাইরে প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহারের গৌরব অর্জন করল।
কঠোর নিরাপত্তা বলয়
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার খাতিরে এই ডিজিটাল সিস্টেমটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সে কারণে, সাইবার নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ওআইএসএস (OISS) প্রযুক্তিটি শুধুমাত্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদিত এবং নির্দিষ্ট কর্মীদের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্যই সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধ থাকবে।
এই উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ মূলত বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যেন সর্বোচ্চ নিরাপদ, নিখুঁত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, তার জন্য বিশ্বমানের বিশ্বস্ত প্রযুক্তি গ্রহণের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারকেই পুনর্ব্যক্ত করে।
