আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নানা বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। গত ১২ দিনে ট্রাম্পের একের পর এক মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে এসব কর্মকাণ্ডকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিএনএনের বিশ্লেষক অ্যারন ব্লেকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভোটারদের জন্য ৫ হাজার ডলারের অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, দুর্যোগ সহায়তা নিয়ে মন্তব্য, বিদেশি বাণিজ্য বন্ধের হুমকি এবং গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের মতো বিষয় রয়েছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প ঘোষণা দেন, রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। রয়টার্স-ইপসোসের সেপ্টেম্বরের জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের ৬৬ শতাংশ এ ধরনের প্রস্তাবকে ‘অনুপযুক্ত’ বলে মনে করেছেন, যেখানে ১৮ শতাংশ এটিকে উপযুক্ত বলেছেন।
উত্তর ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর নির্বাচিত হলে ওই রাজ্যে দুর্যোগ সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও বিতর্ক তৈরি করেছে। পরে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি বিষয়টি রসিকতা করে বলেছেন। তবে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগে ডেমোক্র্যাট-শাসিত রাজ্যগুলোর জন্য ফেডারেল অনুদান ও সহায়তার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।
নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভোটারদের মধ্যে নেতৃত্বের ধরন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন জরিপের তথ্য তুলে ধরে সিএনএন বলেছে, ৬৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করেন না। ৭১ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্পের আচরণ ‘স্থির মেজাজের’ নয়।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও মার্কিন ভোটারদের বড় একটি অংশের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ফক্স নিউজ ও সিএনএনের জরিপে ৭০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ও নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে তারা মনে করেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এসব ধারণা পরিবর্তনের বদলে আরও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৯/১১ ও হত্যাচেষ্টা নিয়ে বিতর্ক
৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকীর আগে ট্রাম্প নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোর কাছে নিজের উপস্থিতি ও সেখানকার ঘটনাবলি নিয়ে একটি বর্ণনা দেন। তবে ওই ঘটনার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্যের সঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্যের কিছু অসঙ্গতি রয়েছে বলে সিএনএনের ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে ২০২৪ সালের পেনসিলভানিয়ার বাটলারে ট্রাম্পের ওপর হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এটি ছিল তাকে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি ‘ডেমোক্র্যাট ষড়যন্ত্র’। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।
এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলও কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেন, হামলাকারী থমাস ক্রুকসের সঙ্গে তার বাবা-মা ছাড়া অন্য কারও যোগাযোগের প্রমাণ এফবিআইয়ের হাতে নেই। ক্রুকস রিপাবলিকান পার্টির নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন।
বাণিজ্য ও সুদের হার নিয়ে নতুন হুমকি
ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার না কমালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে—এমন দেশগুলোর সঙ্গে বড় পরিসরে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প।
উত্তর ক্যারোলাইনায় এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, বাণিজ্য ঘাটতি থাকা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্র বছরে অন্তত ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। তবে এ হিসাব ও যুক্তির অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা
সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট হাউস থেকে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোর সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্তও আলোচনায় এসেছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব গণমাধ্যমকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। এরপর সিএনএনের এক সাংবাদিককে হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং তার প্রেস পাস জব্দ করা হয়। পলিটিকো ও এমএস নাওয়ের সাংবাদিকদেরও একই ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
কেনেডি সেন্টার নিয়েও বিরোধ
ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে নিজের নাম যুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা নিয়েও বিতর্ক চলছে। ট্রাম্পের মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়েও তিনি সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তাদের নিয়োগের সময় যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তারা বর্তমানে ‘আগের মতো নেই’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
এর বাইরে আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের ইতিবাচক মন্তব্য দীর্ঘদিনের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রচলিত অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নতা তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকেও তিনি ‘হোক্স’ বা ভিত্তিহীন প্রচারণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বার্তা কতটা কার্যকর হবে?
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তার রাজনৈতিক আচরণ, বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে ‘টেম্পারামেন্ট’ বা আচরণগত স্থিরতার প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছিল। সময়ের সঙ্গে মার্কিন জনগণের একটি অংশ এসব আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়গুলো আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টি যখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে সংশয় রয়েছে, তখন তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই সংশয় কমানোর বদলে আরও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
তবে এসব কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া, নির্বাচনী প্রচারণা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর।
