বিরল খনিজের বাজারে চীনের আধিপত্য রুখতে একজোট ভারত-যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিরল খনিজ (Rare Earth Minerals) রপ্তানিতে চীনের একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে এবার একজোট হয়েছে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি। আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ‘অস্ত্র’ হিসেবে বিবেচিত এই খনিজ সম্পদের চাবিকাঠি দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিংয়ের কব্জায় রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে চীনের এই একাধিপত্যে বড় ধাক্কা দিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এক বিশেষ কৌশলগত রূপকল্প (Vision Document) স্বাক্ষর করেছে।
গত ২৬ মে নয়াদিল্লির রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘হায়দরাবাদ হাউস’-এ কোয়াড (Quad) পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনের সাইডলাইনে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হয়। ভারতের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির মূল লক্ষ্য: একচেটিয়া আচরণের অবসান
চুক্তির আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, কোনো “একক উৎসের একচেটিয়া এবং জবরদস্তিমূলক আচরণ” থেকে নিজেদের প্রযুক্তি খাতকে সুরক্ষিত রাখাই এই জোটের প্রধান লক্ষ্য। ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে চীন যদি কখনো কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি দুই দেশের জন্য বিকল্প ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে কাজ করবে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এই চুক্তিকে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জটিল সংকট সমাধানের পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে বলেন:
“এই বিশেষ রূপকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বিরল খনিজ ও কৌশলগত ধাতু খনি থেকে উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রিসাইক্লিং এবং বিনিয়োগসহ প্রতিটি স্তরে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করা। এটি নিশ্চিতভাবেই একটি সুরক্ষিত, স্থিতিশীল ও বহুমুখী সাপ্লাই চেইন গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে খনিজ পদার্থের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য বা স্ক্র্যাপ পুনর্ব্যবহার এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রেও আমাদের যৌথভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে।”
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চীনের এই খনিজ-রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন:
“আমাদের দুটি দেশেরই একটি অভিন্ন ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। আমাদের মতো প্রাণবন্ত ও উদ্ভাবনী অর্থনীতির দেশগুলো তাদের শিল্পের মূল কাঁচামালকে কোনো একক দেশের একচেটিয়া আধিপত্যের মুখে অরক্ষিত রেখে দিতে পারে না। সেই একক উৎস কেবল যুদ্ধের সময়ই যে আমাদের সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করতে পারে তা-ই নয়; বরং সাধারণ সময়েও তারা এটিকে আমাদের সার্বভৌম জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।”
যেভাবে ভাঙা হবে চীনের একাধিপত্য
বিরল খনিজ বা স্ট্র্যাটেজিক মেটাল মাটির নিচ থেকে উত্তোলন করলেই তা সরাসরি চিপ, সেমিকন্ডাক্টর বা আধুনিক ব্যাটারিতে ব্যবহার করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত জটিল ও উন্নত রিফাইনিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এই রিফাইনিং প্রযুক্তির প্রায় ৯০% এককভাবে চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই পরনির্ভরশীলতা কাটাতে চুক্তি অনুযায়ী ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে নিজেদের ভূখণ্ড এবং অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলোতে বড় বড় রিফাইনিং ফ্যাক্টরি বা শোধনাগার তৈরি করবে। এর ফলে চীন যদি কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধও করে দেয়, তবুও অন্য উৎস থেকে আনা কাঁচামাল ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রযুক্তিতেই ব্যবহারের উপযোগী করে নিতে পারবে। এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে চীনের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
