ঢাকা
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ: স্কুলগুলোর অবস্থা কতটা জরাজীর্ণ

ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ: স্কুলগুলোর অবস্থা কতটা জরাজীর্ণ

ফ্রান্সের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর (লিসে) পরিস্থিতি নিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির শত শত উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।

এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। 

বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা বৈষম্যে ভুগছে। অনেক স্কুলের ভবন জরাজীর্ণ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি এবং প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক ও অর্থের ঘাটতি রয়েছে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে ‘যৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

 

তবে তিনি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, শিক্ষকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার মতো বিষয়গুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ফ্রান্সের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি আসলে কতটা খারাপ? শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পেছনে প্রধান সমস্যাগুলোই বা কী?

ফরাসি শিক্ষা ব্যবস্থা কি সামাজিক বৈষম্যে জর্জরিত?

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) মতে, ফ্রান্সে সুবিধাবঞ্চিত পরিবার ও এলাকায় বেড়ে ওঠা শিশুদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় কম।

ওইসিডির ফরাসি শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়ের বলেন, ফ্রান্সে সুবিধাপ্রাপ্ত ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ফলাফলের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। তার ভাষায়, ‘প্রায়ই সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরাই সুবিধাবঞ্চিত স্কুলে পড়াশোনা করে।

’ এর ফলে এসব স্কুলে শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। 

শিক্ষক সংগঠন ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ফ্রান্সে একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ ও ফলাফল অনেকাংশে তার পারিবারিক আর্থিক অবস্থা, বসবাসের এলাকা ও সামাজিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, একটি শিশু কোথায় জন্মেছে এবং কোন এলাকায় বেড়ে উঠছে, তার শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ সুযোগের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ফ্রান্সের উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনগুলো কি জরাজীর্ণ, ইঁদুরে ভরা এবং ছাদ ধসে পড়ছে?

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশেটির কিছু স্কুলের অবস্থা সত্যিই খারাপ। বিশেষ করে কয়েকটি শহর ও নিম্নআয়ের উপশহরে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ধারণ করা ভিডিওতে স্কুলগুলোর নানা সমস্যা উঠে এসেছে। কোথাও ছাদ থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ছে, কোথাও ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে। অনেক স্কুলের দেয়াল ও ছাদে গর্ত, শৌচাগার ভাঙা এবং পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিলও নেই। ফলে শিক্ষকদের এক শ্রেণিকক্ষ থেকে অন্য শ্রেণিকক্ষে চেয়ার-টেবিল বহন করতে হচ্ছে। 

কিছু শিক্ষার্থী জানিয়েছে, ছাদ থেকে পানি পড়ার সময়ও তাদের ক্লাস করতে হয়েছে। পানি থেকে বাঁচতে কোথাও কোথাও ডেস্ক সরিয়ে নিয়ে ক্লাস করতে হয়েছে। এ ছাড়া গত মে ও জুন মাসের তাপপ্রবাহের সময় অনেক স্কুলের শ্রেণিকক্ষের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে উঠে যায়। এতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে ক্লাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের হাজার হাজার স্কুল ভবনের মেরামত ও সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত অনেক পুরোনো ভবনও রয়েছে। ফ্রান্সের বিভিন্ন আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। তবে পুরোনো ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আরো বেশি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে।

একটি ফরাসি সিনেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে স্কুল ভবনগুলোর সংস্কার ও মেরামতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে।

অন্য দেশের তুলনায় ফ্রান্সের স্কুলে কি ক্লাসে শিক্ষার্থী বেশি?

দেশটির শহরের স্কুলগুলোতে ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। ওইসিডির শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়ের বলেন, ফ্রান্সে একটি ভাষার ক্লাসে গড়ে ২৯ জন শিক্ষার্থী থাকে। ওইসিডিভুক্ত অন্যান্য দেশে এই সংখ্যা গড়ে ২৬ জন।

তবে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। প্যারিস ও এর আশপাশের এলাকার অনেক উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি ক্লাসে ৩৬ জন বা তারও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলোতে একই ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির স্কুলগুলোতে ক্লাসের আকার আরো বড় হয়েছে।

ফ্রান্সে কি স্কুলের সময় বেশি?

ইসিডির শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়ের বলেন, ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা ওইসিডিভুক্ত বেশিরভাগ দেশের তুলনায় বছরে বেশি সময় শ্রেণিকক্ষে কাটায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক, দুই স্তরেই এই চিত্র দেখা যায়। তবে ফ্রান্সে বছরে স্কুল খোলা থাকে মাত্র ৩৬ সপ্তাহ, যা ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর গড়ের চেয়ে কম। ফলে তুলনামূলক কম সপ্তাহে বেশি ক্লাস করানো হয়।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেছে, অনেক স্কুলে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ক্লাস চলে। দিনের মধ্যে দীর্ঘ বিরতি থাকায় স্কুলে থাকার সময় আরো বেড়ে যায়।

শিক্ষকদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে। এতে ক্লাসের সময়সূচি তৈরি করা আরো জটিল হয়ে পড়েছে। ফরাসি সরকার স্কুলের দৈনিক সময়সূচি ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে থাকার সময় পর্যালোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় কি সবসময় নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়?

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন শিক্ষক সবসময় নিয়োগ দেওয়া হয় না। ফলে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থেকে বঞ্চিত হয়। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন কারণে সারা বছর প্রায় ১০ শতাংশ নির্ধারিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। এই সমস্যা সমাধান করা জরুরি বলেও মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে।

শিক্ষক ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউর  হিসাবে, চলতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ফ্রান্সের অর্ধেকের বেশি সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে অন্তত একজন শিক্ষকের ঘাটতি ছিল। বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিম্নআয়ের এলাকার স্কুলগুলোতে অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় নতুন শিক্ষক পাওয়া কঠিন।

গত বছর ফরাসি পার্লামেন্টে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন বামপন্থী দল ‘লা ফ্রঁস আঁসুমিজ’-এর এমপি বাস্তিয়েন লাশো। তিনি জানতে চান, প্যারিসের বাইরে অবস্থিত তুলনামূলক দরিদ্র এলাকা সেন-সাঁ-দেনির শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত শিক্ষকদের কারণে তাদের মোট ক্লাসের ২০ শতাংশ পর্যন্ত হারাচ্ছে, এমন একটি হিসাব সরকার নিশ্চিত করতে পারে কি না।

এই হিসাবটি ২০১৯ সালে অভিভাবকদের সংগঠন এফসিপিই  প্রকাশ করেছিল। সংগঠনটির দাবি ছিল, এর ফলে একজন শিক্ষার্থীর পুরো শিক্ষাজীবনে প্রায় এক বছরের সমপরিমাণ ক্লাস নষ্ট হতে পারে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই হিসাব নিশ্চিত করেনি।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় নতুন শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষক ইউনিয়নগুলোর মতে, শুধু শিক্ষক নয়, স্কুল নার্স এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তাকারী কর্মীসহ অন্যান্য অশিক্ষক কর্মীরও ঘাটতি রয়েছে।

ফ্রান্স কি প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় উচ্চ বিদ্যালয়ে কম অর্থ খরচ করে?

১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ে ফ্রান্স অনেক দেশের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করে। তবে শিক্ষা বিশ্লেষকদের প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কীভাবে খরচ করা হচ্ছে এবং এর বিনিময়ে শিক্ষার্থীরা কতটা ভালো ফল পাচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে, ফ্রান্সে শিক্ষকদের চাকরির মাঝামাঝি ও শেষ পর্যায়ের বেতন তুলনামূলকভাবে কম।

ওইসিডির শিক্ষা বিশ্লেষক এরিক শারবোনিয়ের বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় ফ্রান্সের ব্যয় ওইসিডির গড়ের চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকসহ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে ফ্রান্সের ব্যয় ওইসিডির গড়ের চেয়ে ১১ শতাংশ কম।’

তার মতে, উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ে ফ্রান্সের বেশি ব্যয়ের অন্যতম কারণ হলো দেশটিতে বিস্তৃত ও ব্যয়বহুল কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এসব কর্মসূচির অনেকগুলোই ফ্রান্সের মধ্যেই যথেষ্ট স্বীকৃতি বা মূল্যায়ন পায় না।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে