পাকিস্তান ও চীনের ‘নতুন বিস্তৃত ঐকমত্য’, জোর পাচ্ছে সিপিইসি ২.০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করা, কৌশলগত সমন্বয় জোরদার এবং বিভিন্ন খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে একটি নতুন বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছেছে পাকিস্তান ও চীন। মঙ্গলবার (২৬ মে) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। উভয় দেশই উচ্চমানের উন্নয়ন এগিয়ে নিতে একমত প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ২.০’ (সিপিইসি ২.০) এর উন্নয়ন জোরদার করা এবং এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানোর বিষয়েও দেশ দুটি সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ও কূটনৈতিক ৭৫ বছর
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে সম্প্রতি চার দিনের বেইজিং সফর শেষ করেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।
এছাড়াও শেহবাজ শরিফ চীন-পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংঝৌ শহর সফর করেন। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশই ‘চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্বকে’ একটি অন্যতম প্রধান কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা বিভিন্ন প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও অটল রয়েছে। উভয় পক্ষই ২০২৫-২০২৯ কর্মপরিকল্পনার আওতায় আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ অভিন্ন ভাগ্যসহ ‘চীন-পাকিস্তান কমিউনিটি’ গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছে।
নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা
পাকিস্তানে কর্মরত চীনা নাগরিক, বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসলামাবাদ। অন্যদিকে চীনও পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে তাদের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
উভয় দেশই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমনে দ্বৈত নীতি বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসবিরোধী ইস্যু ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করেছে।
বিবৃতিতে উভয় পক্ষ জোর দিয়ে বলেছে,”তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং ইস্টার্ন তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম)-এর মতো কোনো গোষ্ঠীকেই কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে দেওয়া যাবে না।”
‘এক চীন’ নীতি ও আঞ্চলিক অবস্থান
পাকিস্তান ‘এক চীন’ নীতির প্রতি তার দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ জিনজিয়াং, জিজাং (তিব্বত), হংকং ও দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছে। বিপরীতে, চীনও পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্থিতিশীলতার প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও সিপিইসি ২.০
দুই দেশ বেইজিংয়ের ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় সহযোগিতা জোরদার এবং সিপিইসি ২.০ কাঠামোর অধীনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছে। এর পাশাপাশি ঐতিহাসিক কারাকোরাম হাইওয়ে পুনঃনির্মাণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গোয়াদর বন্দরকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পে যেকোনো তৃতীয় পক্ষের ইতিবাচক অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে উভয় দেশ।
প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বৈশ্বিক বিষয়
উভয় দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিষয়ক বিশ্বব্যাপী শাসন ব্যবস্থার জন্য চীনের প্রস্তাবিত ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’ গঠনে একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া, পাকিস্তান ও চীন জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং একটি সুষম বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসন ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যু ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি
বৈঠকে পাকিস্তান পক্ষ চীনকে জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। এ প্রসঙ্গে চীন জানায়, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান জাতিসংঘ সনদ, প্রাসঙ্গিক নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে হওয়া উচিত।
পাশাপাশি, দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীন পাকিস্তানের সামগ্রিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা প্রশমন ও যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকার ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছে বেইজিং।
