যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে সংঘাত থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছিল সৌদি আরব। তবে তিন দিক থেকে ধারাবাহিক হামলার মুখে এবার অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে দেশটি। চলতি সপ্তাহে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে রিয়াদ। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই গোষ্ঠীগুলোই ড্রোন হামলার মাধ্যমে দেশটিকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে এখন বড় প্রশ্ন— হামলার জবাবে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে, নাকি উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে রয়েছে ইরান ও দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের মিত্র হিসেবে রয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ। যদিও বর্তমানে হিজবুল্লাহ তুলনামূলকভাবে নীরব অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং বিভিন্ন মাত্রায় সৌদি আরব, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র ও জর্ডান। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বর্তমানে এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে, বিশেষ করে যারা ইরানের নির্ধারিত রুট অনুসরণ করছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের মিলিশিয়া ও ইয়েমেনের হুথিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা না হলে পুরো অঞ্চল আরও বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে না চাওয়ার পেছনে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। দেশটির কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শিল্প, প্রযুক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। নতুন শিল্পাঞ্চল, ডেটা সেন্টার ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিবেশ অপরিহার্য।
কিন্তু ইয়েমেন থেকে হুথিদের ড্রোন হামলা কিংবা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের স্থায়ী হুমকি সেই পরিকল্পনার জন্য বড় বাধা হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলার অভিজ্ঞতাও নতুন নয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলায় কয়েক দিনের জন্য দেশটির প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়েও স্যাটেলাইট চিত্রে আবকাইক স্থাপনায় নতুন করে হামলার আলামত দেখা গেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এ হামলার পেছনেও ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা জড়িত।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করে রপ্তানির চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু সেই বিকল্প পথও এখন ঝুঁকির মুখে।
গত ১৩ জুলাই ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর হামলার পর পাল্টা জবাবে হুথিরা আবহা ও জিজান আঞ্চলিক বিমানবন্দরে হামলা চালায়। এরপর তারা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলও লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে। এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা এশিয়ার বাজারে সৌদি তেল রপ্তানিতে নতুন সংকট তৈরি করেছে।
সাত বছর ধরে সামরিক অভিযান চালিয়েও হুথিদের পরাজিত করতে পারেনি সৌদি আরব। ২০২২ সালে উভয় পক্ষ একটি নাজুক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও সাম্প্রতিক সংঘাত সেই সমঝোতাকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরে ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী এবং দক্ষিণে হুথিদের একযোগে হামলার মুখে সৌদি আরব এখন এমন এক নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে, যা দেশটির ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
