বিশেষ প্রতিবেদন:
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মঞ্চ জাতিসংঘ। আর সেই মঞ্চেই আজ তৈরি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়। একই পরিবারের তিন প্রজন্ম—পিতা, মাতা ও পুত্র—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে জিয়া পরিবারের সঙ্গে বিশ্বসংস্থাটির দীর্ঘ সম্পর্ককে।
বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোরে, নিউইয়র্ক সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম ভাষণ। তিনি বাংলায় বক্তব্য দেবেন।
এর মধ্য দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্বসভায় দাঁড়াবেন তারেক রহমান। চার দশকেরও বেশি সময় আগে যে যাত্রার শুরু, আজ তা পৌঁছাবে তৃতীয় প্রজন্মে।
শুরুটা করেছিলেন জিয়াউর রহমান
১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। জাতিসংঘের সংরক্ষিত নথিতে তার সেই বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ রয়েছে।
সেদিনের ভাষণে জিয়াউর রহমান বিশ্বে ধনী ও দরিদ্র দেশের বৈষম্য, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—আন্তর্জাতিক উন্নয়নের নানা অঙ্গীকারের পরও কেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে আছে।
তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং বিশ্বের দেশগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধ। অর্থাৎ জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রথম জিয়া পরিবারের কণ্ঠ ছিল মূলত বৈশ্বিক বৈষম্য ও উন্নয়ন-ন্যায়ের প্রশ্নে সোচ্চার।
১৩ বছর পর একই মঞ্চে খালেদা জিয়া
এর ১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
এতেই তৈরি হয় একটি অনন্য পারিবারিক ধারাবাহিকতা—একই পরিবারের স্বামী ও স্ত্রী, দুই রাষ্ট্রনায়ক, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এরপরও জাতিসংঘের বিভিন্ন সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট অধিবেশনে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি ও বক্তব্য অব্যাহত থাকে। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে পাঁচবার বক্তব্য দেন। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণসভা, ২০০২ সালের শিশু বিষয়ক বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালের ৬০তম সাধারণ অধিবেশনের কার্যক্রমও রয়েছে।
এবার তৃতীয় প্রজন্ম
১৯৮০ সালে পিতা।
১৯৯৩ সালে মাতা।
আর ২০২৬ সালে পুত্র।
এই তিনটি সময়কে পাশাপাশি রাখলে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। জিয়াউর রহমানের ভাষণের ৪৬ বছর পর এবং খালেদা জিয়ার প্রথম জাতিসংঘ ভাষণের ৩৩ বছর পর একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বসভায় বক্তব্য রাখতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
আজকের ভাষণ তাই শুধু একটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; একই পরিবারের তিন প্রজন্মের জাতিসংঘ-সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টার দিকে সাধারণ পরিষদ হলে তারেক রহমান বক্তব্য দেবেন। বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী তা শুক্রবার ভোর প্রায় ৩টা। তিনি ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ১৮ জন বক্তার মধ্যে ১১তম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে এবং স্বেচ্ছাধীন সময়সীমা ১৫ মিনিট।
বাংলাদেশের কথা উঠবে বিশ্বমঞ্চে
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক যাত্রা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পেতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জলবায়ু অর্থায়ন ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানও আলোচনায় থাকার কথা।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নিউইয়র্ক সফরে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়টিও সরকারের কর্মসূচিতে রয়েছে।
বাংলায় বক্তব্য উপস্থাপন
তারেক রহমানের ভাষণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে—তিনি বাংলায় বক্তব্য দেবেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই বক্তব্যে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা তুলে ধরা হবে।
ফলে জাতিসংঘের সুবিশাল সাধারণ পরিষদ হলে আজ একই সঙ্গে দুটি ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান হবে—একদিকে জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের উপস্থিতি, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে বাংলা ভাষায় বিশ্বদরবারে তুলে ধরা।
একটি পরিবারের তিন প্রজন্ম
জাতিসংঘের ইতিহাসে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণ অসংখ্য। কিন্তু একই পরিবারের পিতা, মাতা এবং সন্তানের তিন প্রজন্ম ধরে এই বিশ্বমঞ্চে নিজ নিজ সময়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতার প্রথম নাম জিয়াউর রহমান, দ্বিতীয় নাম খালেদা জিয়া এবং তৃতীয় নাম তারেক রহমান।
১৯৮০ সালে পিতার কণ্ঠে ছিল ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রশ্ন।
১৯৯৩ সালে মায়ের কণ্ঠে যুক্ত হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়।
আর ২০২৬ সালে পুত্রের সামনে রয়েছে বদলে যাওয়া এক বিশ্ব—জলবায়ু সংকট, রোহিঙ্গা সমস্যা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রযুক্তি, শান্তি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন বাস্তবতা।
একই পরিবারের তিনটি প্রজন্ম, তিনটি সময়কাল, তিনটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক বাস্তবতা—কিন্তু মঞ্চ একটিই: জাতিসংঘ।
আজকের ভাষণের পর তাই শুধু তারেক রহমানের বক্তব্যই নয়, আলোচনায় থাকবে আরও বড় একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়—একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের জাতিসংঘ-যাত্রা।
১৯৮০ থেকে ১৯৯৩, আর সেখান থেকে ২০২৬—প্রায় সাড়ে চার দশকের এই পথচলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি জিয়া পরিবারের আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থিতিরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
