নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার ক্ষত না শুকাতেই নতুন করে বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া নতুন একটি নদীর পাড় ভেঙে গেছে। ফলে ওই এলাকায় আবারও বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বুধবারের (২৬ আগস্ট) হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৬৩৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি।
দুদিন পর শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নদীর পাড় ভেঙে যাওয়ায় ওই এলাকায় উদ্ধার অভিযান কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। বন্যার স্থানে নেপাল-চীন সীমান্তে ধ্বংসাবশেষ জমে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। পানি ক্রমেই বাড়তে থাকায় সেই হ্রদও বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আসলে কী ঘটেছে?
শুক্রবার নেপালের রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে বলে তারা খবর পেয়েছেন।
রাসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, নদীতে পানির উচ্চতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
তবে হ্রদটিতে ঠিক কত পানি জমেছে বা পানির উচ্চতা কত, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগের ফলে একটি নয়, দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায়, সেখানে হিমবাহ গলে যাওয়া পানি আটকে আছে। অন্যটি আকারে অনেক বড় এবং বেশি বিপজ্জনক। নেপালের একটি নদীর ওপর বিশাল ভূমিধস নেমে উপত্যকার পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে পানি আটকে এই হ্রদ তৈরি হয়েছে।
হ্রদটি কোথায়?
নেপালের লহেন্দে নদী ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে নতুন হ্রদটি তৈরি হয়েছে।
‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্রদটি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই দুই নদী দক্ষিণ দিকে বয়ে কাঠমান্ডুর দিকে যায়।
কীভাবে তৈরি হলো নতুন হ্রদ?
বুধবারের হিমবাহ ধস থেকেই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। একই ঘটনায় ভূমিধসও ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীগুলোর মধ্যে গিয়ে পড়ে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই বলেন, নতুন হ্রদটি সম্ভবত বরফ-পাথরের ধসের কারণে তৈরি একটি প্রাকৃতিক বাঁধের হ্রদ।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর উপত্যকায় জমে নদীর পানি চলাচলের পথ বন্ধ বা সংকুচিত করে দেয়। এরপর সেই প্রাকৃতিক বাধার পেছনে পানি জমতে জমতে হ্রদ তৈরি হয়।
স্যাটেলাইট ছবি এবং চীনা কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই হ্রদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা নিয়ে কাজ করা ভূগোলবিদ নিতেশ খড়কা বলেন, স্যাটেলাইট ছবি ও ড্রোনের ভিডিওতে দুর্যোগের পর দুটি হ্রদ তৈরির বিষয়টি দেখা গেছে। একটি তৈরি হয়েছে উঁচু এলাকায় এবং অন্যটি লহেন্দে নদীর ওপর।
তার মতে, চীনের অংশে তৈরি ওপরের হ্রদটি হিমবাহ গলে যাওয়া পানি আটকে যাওয়ার ফলে তৈরি হয়েছে। আর লহেন্দে নদীর হ্রদটি ভূমি ও কাদার ধসের কারণে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে পানি আটকে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে।
খড়কা বলেন, এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে হ্রদটি বিপজ্জনক হয়ে উঠলে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যদিও দুর্গম ও জটিল ভূখণ্ডের কারণে সেটিও বাস্তবে করা কঠিন হতে পারে।
ভট্টরাই বলেন, হিমবাহ ধস ও এর ফলে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ সম্ভবত ঠেকানো সম্ভব ছিল না। তবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আরও ভালো নজরদারি, নদীর গতিপথে বাধা ও নতুন হ্রদ তৈরির দ্রুত শনাক্তকরণ, নদীর পানির তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, সময়মতো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং নেপাল-চীনের মধ্যে শক্তিশালী আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমানো যেত।
কী ঝুঁকি?
বৃহস্পতিবার নেপাল ও চীনের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেন, বন্যার স্থানে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে নিচের দিকে একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানিয়েছে, হ্রদটির পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে যেকোনো সময় এর প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্রদটির আকাশপথে পর্যবেক্ষণ ও ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরির জন্য চীনা কর্তৃপক্ষ আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠিয়েছে।
তবে দুর্গম এলাকার কারণে সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রকৌশলী দলের সদস্য চেন হানশিয়াও বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদ তৈরির পর এর আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি ঢাল তৈরি হয়েছে।
কেন এত বড় ঝুঁকি?
হঠাৎ তৈরি হওয়া হ্রদকে ধরে রাখার মতো শক্তিশালী প্রাকৃতিক কাঠামো অনেক সময় থাকে না। তার ওপর হ্রদের পানি যদি আলগা পাথর ও কাদার তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকে, তাহলে সামান্য পানি উপচে পড়লেও সেই বাঁধ ক্ষয় হতে পারে। একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বিশাল বন্যা নেমে আসতে পারে।
ভট্টরাই বলেন, শুধু হ্রদটিই বিপদের কারণ নয়; সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া। এমন খাড়া পাহাড়ি উপত্যকায় অল্প সময়ের জন্য বাঁধ ভাঙলেও খুব দ্রুত ধ্বংসাবশেষবাহী বন্যা নেমে আসতে পারে। এতে নিচের দিকে থাকা মানুষদের সতর্ক করার সময়ও খুব কম থাকবে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার অনুমান করেছে, হ্রদটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে। পাশাপাশি আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে জমতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
রাসুয়ার এবারের ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো তদন্ত করা হচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে এ ধরনের ঘটনা হিমালয়ে একেবারে নজিরবিহীন নয়।
হিমবাহ ধস ও জিএলওএফ কী?
সহজভাবে বললে, হিমবাহ ধস হলো যখন হিমবাহের বিশাল একটি অংশ তার অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে আসে।
এ ধরনের ঘটনায় কখনো কখনো লাখ লাখ ঘনমিটার বরফ, পাথর ও পানি একসঙ্গে নেমে আসে। পরে তা অত্যন্ত দ্রুতগতির বরফ ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হতে পারে।
আর গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ হলো হিমবাহ থেকে তৈরি বা হিমবাহের পানি জমে থাকা কোনো হ্রদ থেকে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি বেরিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হওয়া।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু পর্বতমালায় একটি উপত্যকা হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে যায়। এতে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। ঘটনায় নয়জন পশুপালক ও শত শত গবাদিপশু মারা যায়। ঘটনাটি ভারতের-চীন সীমান্তের কাছে, প্যাংগং সো এলাকার পশ্চিম তিব্বতে ঘটেছিল।
এর দুই মাস পর কাছাকাছি আরেকটি হিমবাহ ধসে পড়ে। এতে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে আসে।
২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের কিংহাই প্রদেশে তিব্বতি মালভূমির উত্তর প্রান্তের কুনলুন পর্বতমালায় বুকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকে প্রায় ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বরফের বিশাল ধস নিচের একটি হ্রদে পড়ে প্রায় ১৩ মিটার (৪২ ফুট) উঁচু ঢেউ সৃষ্টি করেছিল।
উত্তর পাকিস্তানেও জিএলওএফ-এর ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের মে মাসে হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় শিসপার হিমবাহ থেকে তৈরি বরফের বাঁধে থাকা একটি হ্রদ হঠাৎ ভেঙে গেলে সেখানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
