আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ২৬তম বছরে পা রেখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকার অভাবনীয় এক চতুর্মুখী বা ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছেন। অর্থনীতিতে স্থবিরতা, প্রশাসনিক স্থবিরতা, নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি সংকট এবং তরুণদের রাজপথে নেমে আসার ঘটনা মিলিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক অবস্থান এক বিশাল কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’-এ প্রকাশিত প্রখ্যাত সাংবাদিক শেখর গুপ্তর এক বিশ্লেষণে মোদি সরকারের এই বর্তমান পরিস্থিতিকে চতুর্মুখী সংকট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির মূল তিন স্তম্ভ—কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদ, গণকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং দৃশ্যমান বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়ন—সবই এখন ভারতের চড়াও মুদ্রাস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনাস্থার কারণে প্রচণ্ড চাপের মুখে। এমনকি দেশটির গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত সংবিধানের প্রতি আস্থা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে এসেছে।
দুর্বল নির্বাচন কমিশন ও টলে যাওয়া অর্থনীতি
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, ভারতের নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অতীতে কখনো এতটা দুর্বল ও আস্থাহীনতার মুখে পড়তে দেখা যায়নি। নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয়ের পাশাপাশি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনারদেরও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মতামত দিতে দেখা যাচ্ছে। শীর্ষ বিচার বিভাগের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে অসন্তুষ্ট সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষই। একই সঙ্গে ভারতের সাবেক শীর্ষ আমলা সুভাষচন্দ্র গর্ভ জিডিপির সরকারি হিসাব ও পরিসংখ্যানে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব তুলে ধরায় অস্বস্তিতে পড়েছে মোদি প্রশাসন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে দ্রুত গতিতে। ভারতে মূল্যস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যার ফলে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে রুপি। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা এবং অভ্যন্তরীণ শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক দরপতনে কোটি কোটি মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ওপর বৃষ্টিপাতের মারাত্মক ঘাটতি ও খরায় দেশের কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ও জেন-জি তরুণদের রাজপথ দখল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজপথে নেমে আসা প্রথমবার ভোটাধিকার পাওয়া ‘জেন-জি’ (Gen-Z) তরুণ প্রজন্ম। চলতি বছরের মে মাসে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা (NEET) প্রশ্নফাঁস এবং অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনার পর তরুণদের সংগঠিত করে গড়ে ওঠে ব্যঙ্গাত্মক নামের দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। তৎকালীন সময়ে আন্দোলন থামাতে কঠোর দমনপীড়ন চালানো হলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত ২৫ জুলাই তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে সরকারি স্কুল সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনের পর বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে দলটি। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত বাছাই প্রক্রিয়ায় দেশের প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকার বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যা বিরোধী দলগুলোর মতে বিজেপির অনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্তির ষড়যন্ত্র।
রেকর্ড গ্রেপ্তার ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ
এই প্রেক্ষাপটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে ডাকা সিজেপির সমাবেশ রুখতে শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীজুড়ে অভূতপূর্ব কঠোর নিরাপত্তা বজায় রাখে বিজেপি প্রশাসন। পুরো দিল্লিতে হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, ইন্টারনেট স্থগিত রাখা এবং মেট্রো স্টেশন বন্ধ করার পরও ক্ষোভ আটকানো যায়নি।
শনিবার এক দিনেই পুলিশ দিল্লি ও আশপাশের এলাকা থেকে দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করে। আটক ব্যক্তিদের তালিকায় জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরপ দাস থেকে শুরু করে শীর্ষ বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মানিক সরকার, পিনারাই বিজয়ন এবং একাধিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রয়েছেন।
বদলাচ্ছে ভারতের রাজনীতি
সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর রাজপথের কর্মসূচি গুরুত্ব পাওয়ায় এবং এনডিএ জোটের ছোট শরিক দলগুলোর (যেমন চিরাগ পাসওয়ান বা ওম প্রকাশ রাজভর) প্রকাশ্য সমালোচনায় নরেন্দ্র মোদির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে টান পড়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরে মার্কিন নীতির অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক চাপ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ২০২৭ সালের আসন্ন বেশ কয়েকটি রাজ্য নির্বাচন এবং ২০২৯ সালের জাতীয় সাধারণ নির্বাচনের আগে তরুণদের এই অভূতপূর্ব জাগরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাগ্রহ মোদি সরকারের জন্য আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। কড়া পুলিশি পদক্ষেপ বা বলপ্রয়োগ করে সাময়িকভাবে রাস্তা ফাঁকা করা গেলেও গণতন্ত্র ও জবাবদিহির প্রশ্নে জেগে ওঠা নতুন প্রজন্মকে নিয়ন্ত্রণ করা এবার একেবারেই সহজ হবে না।
