ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » চকরিয়া থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ/ধর্ষিতা কিশোরীর ছবি ফেসবুকে

চকরিয়া থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ/ধর্ষিতা কিশোরীর ছবি ফেসবুকে

নবপ্রকাশ ডেস্কঃ
ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর ছবি তুলে থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে।
গতকাল সোমবার রাতে ভিকটিমের ছবিটি পোস্ট কবার পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।
জানা গেছে, ঈদগাঁও উপজেলার এক কিশোরীর সঙ্গে উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকার নুরুল আমিনের (২৪) প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্কের সূত্র ধরে ওই কিশোরী নুরুল আমিনের বাড়িতে চলে আসেন বলে দাবি ছেলের পরিবারের।
তবে কিশোরীর বাবা অভিযোগ করেন, ২৮ মে তার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় তিনি মামলাও করেন। পরবর্তীতে ৩০ মে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার করে এবং নুরুল আমিনকে আটকের পর ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এ ঘটনায় কিশোরীকে নিজ বাড়িতে দুই দিন আটকে রেখে নুরুল আমিন ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগও আনা হয়েছে। সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে ধর্ষণের সত্যতাও মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে অভিযুক্ত নুরুল আমিনকে মারধরের ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার মুখে পড়ে চকরিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
আলোচিত এ ঘটনার মোড় ঘুরাতেই ওসি ভিকটিমের ছবি থানার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন।
ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, চকরিয়া থানা পুলিশের ওই অভিযানে ভিকটিম কিশোরীকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়। সেখানে নিজের রুমে কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে তার ছবি তুলেন মনির হোসেন নিজেই। সোমবার রাতে থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ছবিটি প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে পেজটি ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেওয়া হয়।
প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, কিশোরীর ওড়নাটি সরিয়ে রাখা হয়েছে ওসির রুমের আসবাবপত্রের ওপর।
কেবল ছবি প্রকাশ করেই ক্ষ্যান্ত হননি ওসি মনির হোসেন। অভিযোগ উঠেছে, আসামি নুরুল আমিনকে মারধরের সমালোচনাকারীদের জবাব দিতে কিশোরীর ছবির সঙ্গে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসও জুড়ে দেন তিনি।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বিরুদ্ধে সমালোচনায় ক্ষুব্ধ হন ওসি মনির। স্থানীয় সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
চকরিয়া থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, এসআই আরকানকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনার জবাব দিতেই পরবর্তীতে ধর্ষণের শিকার ওই অপ্রাপ্তবয়স্ক ভিকটিমের ছবি থানার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। ঘটনাটির পক্ষে জনসমর্থন আদায় এবং সমালোচনার জবাব দিতে ভিকটিমের ছবি ও ঘটনার বিবরণ প্রকাশের পথ বেছে নেন ওসি মনির হোসেন। তবে বিষয়টি উল্টো নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। ভিকটিমের ছবি প্রকাশকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং ওসির বিরুদ্ধে আইন ও নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ফলে সমালোচনা প্রশমিত হওয়ার পরিবর্তে ঘটনাটি নতুন করে জনরোষ ও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ওসির এমন কাণ্ডে ফেসবুকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটিজেনরা। ইসুফ বিন হোসেন নামে স্থানীয় এক সাংবাদিক ফেসবুকে লিখেছেন- একজন ১৪ বছরের কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে ছবি তুলে বিবৃতি দেওয়া কি বেশি জরুরি ছিল? তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভিকটিম কিশোরীর বুকের ওড়না পাশের সোফায় রেখে তার ছবি তুলে চকরিয়া থানা পুলিশের ফেসবুক পেজে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নির্যাতিত কোনো শিশু বা নারীর ছবি ও পরিচয় কোনোভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পত্রিকা বা টেলিভিশনে প্রকাশ করা যাবে না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, অপরাধের শিকার হওয়া নারী বা শিশুর পরিচয় (নাম, ঠিকানা, ছবি ইত্যাদি) এমনভাবে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা তাকে সমাজে চিহ্নিত করে। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল এবং অর্থদণ্ডের স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ভিকটিম মেয়েটির বাবা গণমাধ্যমকে বলেন, আমার মেয়েকে পুলিশ উদ্ধারের পর কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানকার চিকিৎসকরা ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন বলে ওসি স্যার আমাকে জানিয়েছেন। তবে ফেসবুকে আমার মেয়ের ছবি প্রচারের বিষয়ে ওসি স্যার আমাকে কিছুই জানাননি, আমার কোনো অনুমতিও নেননি। মেয়ের মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন কিনা, তাও আমি জানি না।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির (বার) সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট। এ আইন অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার কোনো নারী বা শিশুর ছবি, নাম, ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। আইনের রক্ষক হিসেবে ওসির এ আচরণ শুধু দুঃখজনকই নয়, সরাসরি বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন। তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয় সংবাদকর্মীদের অভিযোগ, ওসির এ বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হলে বা সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের ‘ডাকাতি ও ইয়াবা মামলায় ফাঁসানোর’ হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন তিনি।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, ভিকটিমের কোনো ছবি বা পরিচয়-ঠিকানা কোনোভাবেই প্রচার করা যায় না, এটি আইন পরিপন্থি এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। থানার ফেসবুক পেজে ভিকটিমের ছবি দিয়ে ঠিক করেননি ওসি। আমি তার সঙ্গে কথা বলব। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার কক্সবাজারে এলে এ বিষয়ে এসপি স্যার আর আমি কথা বলব।
ওসির অপসারণসহ পৃথক শাস্তির দাবি
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘কোনো ভিকটিমের ছবি, পরিচয় বা এমন কোনো তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা, যার মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তা স্পষ্টতই আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ সাধারণ মানুষ করুক কিংবা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা করুক, আইনের দৃষ্টিতে উভয়ই সমান অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তিনি বলেন, আইন রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি যদি নিজেই এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত হন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি শুধু আইনের লঙ্ঘন নয় বরং দায়িত্বশীল পদে থাকার নৈতিকতা ও পেশাগত মানদণ্ডেরও পরিপন্থি। একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত হতে পারে না।
আখতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, ভিকটিমের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। সেখানে উল্টো তার পরিচয় বা ছবি প্রকাশ করা হলে তা ভিকটিমের প্রতি দ্বিতীয় দফা অবিচারের শামিল। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ওসিকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে পৃথকভাবে বিভাগীয় তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং প্রচলিত আইনে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে