বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা গণজাগরণকে স্থায়ী রূপ দিতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর জোর দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, “এবারের শিকল ভাঙার মধ্য দিয়ে আমাদের শুধু নতুন করে জাগ্রত হলেই চলবে না; আর যেন কখনোই কেউ শিকল পরানোর সুযোগ না পায়, সেরকম একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আমরা তৈরি করতে চাই।” বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘শিকল ভাঙার জুলাই’ শীর্ষক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পরও জনগণের অধিকার হরণের কঠোর সমালোচনা করে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “বাংলাদেশ জন্মের ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও আমাদের শিকল ভাঙার লড়াই করতে হচ্ছে। একটি স্বাধীন দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ—অথচ তাদের কণ্ঠ, মৌলিক অধিকার ও সৃষ্টিশীল ক্ষমতাকে বারবার শৃঙ্খলিত করা হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই শিকলবদ্ধতার কারণেই দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই কেবল সাময়িক গণজাগরণ নয়, ভবিষ্যতে যেন আর কেউ জনগণকে পরাধীন করতে না পারে, সেজন্য একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।দেশে রাজনৈতিক ও নীতিগত ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়া নিয়ে খেদ প্রকাশ করে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “বারবার শৃঙ্খল ভাঙতে আমাদের রক্ত দিতে হয়েছে, প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সমৃদ্ধির পথে হেঁটে আজ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।”অতীত আন্দোলনের সঙ্গে সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পার্থক্যের কথা তুলে ধরে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, “আগের আন্দোলনগুলো ছিল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষণিক জনবিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে পরিবর্তনের পর আবারও পুরোনো ব্যবস্থাই ফিরে আসত। তবে এবারের লড়াই ছিল ভিন্ন—আমরা কেবল ফ্যাসিবাদের পতন চাইনি, বরং দেশ গড়ার সুস্পষ্ট রূপরেখাও সামনে এনেছি। জনগণকে সেই পরিকল্পনা জানিয়েই আমরা এগিয়েছি।”গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পুরোনো শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “অর্জিত প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বিজয়কে অর্থবহ করতে হলে পুরোনো ব্যবস্থা দিয়ে তা সম্ভব নয়। তাই আমরা যেমন শৃঙ্খলমুক্তির কথা বলেছি, তেমনি রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনীতি মেরামতের ওপরও জোর দিয়েছি।” তিনি আরও জানান, সরকারের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ইতোমধ্যে ৩১ দফা এবং ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।মন্ত্রী আরও বলেন, “অতীতে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের আগে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তী লক্ষ্য স্থির করতে পারেনি; এমনকি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও এমন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নির্ধারিত ছিল না। এবারের আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—পতনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দিকনির্দেশনা হিসেবে আমাদের নেতা তারেক রহমান আগেই ৩১ দফা রূপরেখা দিয়েছেন। আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনেই সামনে এগিয়ে চলছি।”
তিনি বলেন, ‘আমি এই সংকলনের মোড়ক উন্মোচনের মাধ্যমে জাতিকে জানিয়ে রাখতে চাই, আমরা যেমন শিকল ভাঙতে পেরেছি, তেমনি শিকলমুক্ত গণতান্ত্রিক একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতেও আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’
অনুষ্ঠান শেষে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আপনারা সবাই আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া দেখেছেন। তথ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, সেটারই প্রতিধ্বনি করছি।’অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
