ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » হাওরের ফসল রক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে

হাওরের ফসল রক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে

আমিরুল ইসলাম কাগজী:

হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনে বোরো ধান শুধু একটি ফসল নয়, এটি তাদের বছরের একমাত্র বড় আশ্রয়, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে যখন সেই ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন শুধু জমি নয়—ডুবে যায় হাজারো কৃষকের আশা, পরিশ্রম আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। এবারের বন্যায় হাওরের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এক গভীর মানবিক বিপর্যয়, যার প্রতিধ্বনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ও অর্থনীতিতে অনুভূত হবে।
হাওরের কৃষকরা সারা বছর অপেক্ষা করেন এই একটি মৌসুমের জন্য। শীতের শেষে বোরো ধানের চাষ শুরু করে তারা, দিনরাত পরিশ্রম করেন, ঋণ নেন, আশা করেন ভালো ফলনের। কিন্তু প্রকৃতির অপ্রত্যাশিত আচরণ—অকাল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল—সবকিছু মুহূর্তেই ভেস্তে দেয়। এবারের বৃষ্টিতে ধান পঁচে যাওয়া মানে শুধু খাদ্যের ক্ষতি নয়, এটি কৃষকের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য হারানো, সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জীবিকার বিকল্প পথ না থাকায় দারিদ্র্যের গভীর খাদে পতন।
সরকারের পক্ষ থেকে তিন-চার মাস সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এটি কৃষকদের তাৎক্ষণিক দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সহায়তা কি তাদের প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় যথেষ্ট? একটি মৌসুমের পুরো ফসল হারানো মানে যে আর্থিক ক্ষতি, তা কয়েক মাসের সহায়তায় পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে এই সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের জীবনমান উন্নত করতে পারবে না।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে আসছেন—হাওরের বন্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ বাঁধ নির্মাণ। হাওর অঞ্চলে যে বাঁধগুলো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলিতেই পর্যাপ্ত কালভার্ট বা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে যখন অতিরিক্ত বৃষ্টি হয় বা পাহাড়ি ঢল নামে, তখন সেই পানি বের হওয়ার পথ পায় না। বাঁধের ভেতরে পানি জমে থেকে ধানক্ষেত প্লাবিত করে এবং শেষ পর্যন্ত ফসল নষ্ট করে দেয়।
এখানে একটি বড় সমস্যা হলো পরিকল্পনার অভাব। বাঁধ নির্মাণের সময় স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, মৌসুমি পরিবর্তন—এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও নিম্নমানের নির্মাণকাজ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে বাঁধ যেমন কৃষকদের রক্ষা করার কথা, বাস্তবে তা হয়ে ওঠে তাদের দুর্ভোগের কারণ।
সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। হাওর অঞ্চলের জন্য আলাদা করে পানি ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাঁধ নির্মাণের আগে হাইড্রোলজিক্যাল স্টাডি করা জরুরি, যাতে বোঝা যায় কোথায় কতটা পানি প্রবাহিত হয় এবং কোথায় কালভার্ট বা স্লুইস গেট দরকার। বিদ্যমান বাঁধগুলোতেও দ্রুত সংস্কার করতে হবে, বিশেষ করে যেখানে পানি নিষ্কাশনের পথ নেই।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাওরের মানুষ তাদের এলাকার প্রকৃতি ও সমস্যাগুলো সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে অনেক বাস্তবসম্মত সমাধান পাওয়া সম্ভব। শুধু ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রোধ করতে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন ড্রোন মনিটরিং বা জিপিএস ট্র্যাকিং, যাতে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত হয়।
চতুর্থত, কৃষকদের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। হাওর অঞ্চলে শুধু এক ফসলের ওপর নির্ভরশীলতা কৃষকদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। তাই মাছ চাষ, হাঁস পালন বা অন্যান্য ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের আয়ের উৎস বহুমুখী করতে হবে। এতে করে একটি ফসল নষ্ট হলেও তারা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হবে না।
সবশেষে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। অকাল বৃষ্টি ও অনিয়মিত আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং ক্রমেই নিয়মে পরিণত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে হবে এই বাস্তবতা মাথায় রেখে। শুধু অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
হাওরের কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের এই দুর্দশা শুধু তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি বড় আঘাত। তাই তাদের সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
যেদিন হাওরের কৃষকরা নিশ্চিন্তে ফসল তুলতে পারবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে তাদের মুখে হাসি ফুটবে। আর সেই হাসিই হবে আমাদের উন্নয়নের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে