ঢাকা
ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » ঈদুল আযহা : সেকাল ও একাল

ঈদুল আযহা : সেকাল ও একাল

আসিফ ইসলাম জাফরী:

রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আযহা। মুসলিম উম্মাহর জীবনে এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ত্যাগ, আত্মসমর্পণ, মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য মহিমাময় শিক্ষা। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)–এর সেই অসীম ত্যাগের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে পালন করেন কোরবানির ঈদ। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে; কিন্তু ঈদুল আযহার মূল শিক্ষা আজও একই রয়ে গেছে—আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই মানুষ মহত্ত্বের শিখরে পৌঁছায়।
ঈদুল আযহার ইতিহাস মানবসভ্যতার এক গভীর আধ্যাত্মিক অধ্যায়। মহান আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)–কে কোরবানি করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। একজন পিতার জন্য এর চেয়ে কঠিন পরীক্ষা আর কী হতে পারে! কিন্তু আল্লাহর প্রতি সীমাহীন আনুগত্য ও ভালোবাসা তাঁকে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ইসমাইল (আ.)–এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানির ব্যবস্থা করেন। সেই থেকেই কোরবানির এই ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের জীবনে ত্যাগের প্রতীক হয়ে আছে।
সেকালের ঈদুল আযহা ছিল অনেক বেশি সরল, আন্তরিক ও পারিবারিক বন্ধনে পূর্ণ। গ্রামের মানুষ কয়েকদিন আগে থেকেই ঈদের প্রস্তুতি নিত। বাড়ির উঠানে গরু বা ছাগল বেঁধে রাখা হতো। শিশু-কিশোররা সেই পশুর যত্ন নিত, ঘাস খাওয়াত, নাম ধরে ডাকত। কোরবানির পশু যেন পরিবারেরই একজন সদস্য হয়ে উঠত। ঈদের সকাল মানেই ছিল নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ, মসজিদে ঈদের নামাজ, তারপর বাড়ি ফিরে কোরবানি। কোরবানির মাংস ভাগাভাগি করে আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্র মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে ছিল এক অপার্থিব আনন্দ।
তখন সমাজে আন্তরিকতা ছিল বেশি। মানুষ কম সামর্থ্য নিয়েও অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে চাইত। অনেক পরিবার সারা বছর মাংস খেতে পারত না; কোরবানির ঈদে সেই পরিবারগুলোর ঘরে মাংস পৌঁছে দেওয়াকে মানুষ ইবাদতের অংশ মনে করত। কোরবানির আসল সৌন্দর্য ছিল এখানেই—নিজের আনন্দ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় ঈদুল আযহার চিত্রেও এসেছে পরিবর্তন। আজকের নগরসভ্যতায় ঈদের আবেগ অনেকটাই যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। এখন কোরবানির পশু কেনাবেচায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, অনলাইনে পশু কেনা যাচ্ছে, ডিজিটাল পেমেন্টে লেনদেন হচ্ছে। একদিকে এটি আধুনিকতার সুবিধা, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক পুরোনো আবেগ ও মানবিক স্পর্শ।
আগে ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই গ্রামে-গঞ্জে পশুর হাট জমে উঠত। হাটে যাওয়া ছিল এক ধরনের উৎসব। এখন অনেকেই ব্যস্ত জীবনের কারণে অনলাইনে পশু কিনছেন। এতে সময় বাঁচছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রাণবন্ত সামাজিক মিলনমেলা আর আগের মতো দেখা যায় না। শিশুরাও আগের মতো কোরবানির পশুর সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কম পাচ্ছে। ফলে ত্যাগের যে আবেগ ও অনুভূতি ছোটবেলা থেকেই হৃদয়ে গড়ে ওঠার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে কোরবানির উদ্দেশ্য ও মানসিকতায়। ইসলাম যেখানে কোরবানিকে তাকওয়া ও আত্মত্যাগের শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছে, সেখানে অনেক সময় এটি এখন সামাজিক প্রতিযোগিতার রূপ নিচ্ছে। কে কত বড় গরু কিনলো, কার কোরবানির পশুর দাম কত—এসব নিয়ে অহংকারের প্রবণতা দেখা যায়। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” এই শিক্ষাটিই আজ নতুন করে উপলব্ধি করা জরুরি।
তবে সব পরিবর্তনের মধ্যেও ঈদুল আযহার মূল আবেদন এখনও অমলিন। আজও কোটি মানুষ ঈদের সকালে নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের অঙ্গীকার করেন। আজও দরিদ্র মানুষের ঘরে কোরবানির মাংস পৌঁছে যায়। আজও পরিবার-পরিজন একত্রিত হয়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়। পৃথিবী যত আধুনিকই হোক, মানুষের হৃদয়ে ত্যাগের চেতনা কখনও মুছে যায় না।
বর্তমান সময়ে ঈদুল আযহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। পরিচ্ছন্নভাবে কোরবানি সম্পন্ন করা, পরিবেশ দূষণ রোধ করা, দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা—এসব বিষয় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম কখনও বিশৃঙ্খলা বা অপচয়কে সমর্থন করে না। তাই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করতে হলে আমাদের মানবিকতা, সংযম ও দায়িত্ববোধও লালন করতে হবে।
ঈদুল আযহার সেকাল ও একালের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও মূল চেতনা একই। সেকালে মানুষ সরল জীবনে আন্তরিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিত, একালে প্রযুক্তি ও ব্যস্ততার ভিড়ে সেই আবেগ কিছুটা বদলেছে। কিন্তু ত্যাগ, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা এখনও ঈদুল আযহার প্রাণ।
এই ঈদ আমাদের শেখাক—জীবনের স্বার্থপরতা, হিংসা, অহংকার ও সংকীর্ণতাকে কোরবানি করতে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে। সমাজে সাম্য ও সহমর্মিতার আলো ছড়িয়ে দিতে। কারণ প্রকৃত কোরবানি শুধু পশু জবাই নয়; প্রকৃত কোরবানি হলো নিজের ভেতরের পশুত্বকে জবাই করা।
পবিত্র ঈদুল আযহা তাই যুগে যুগে মানুষকে মানবতার পথে আহ্বান জানিয়ে এসেছে। সেকাল থেকে একাল—সময়ের স্রোত বদলেছে, কিন্তু কোরবানির এই চিরন্তন আহ্বান আজও একইভাবে অনুরণিত হয় মানুষের হৃদয়ে।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে