স্পোর্টস ডেস্ক: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৯ দিন। উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো, কানাডা ও আমেরিকার মাটিতে বসছে এবারের বিশ্বমঞ্চ। আর বিশ্বকাপ মেক্সিকোতে ফেরা মানেই ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠা ১৯৮৬ সালের সেই অবিস্মরণীয় টুর্নামেন্ট এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার মহাকাব্যিক ফুটবলশৈলী। কিন্তু আপনি কি জানেন, সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যে ঐতিহাসিক ম্যাচে ম্যারাডোনা তাঁর ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ করেছিলেন, সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা দল খেলেছিল মেক্সিকোর এক সাধারণ বাজার থেকে কেনা ‘নকল’ বা রেপ্লিকা জার্সি পরে? বিশ্বকাপের শতাব্দি প্রাচীন ইতিহাসে এটি অন্যতম এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর ঘটনা।
মেক্সিকোর তীব্র গরম ও বিলার্দোর দুশ্চিন্তা
১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে আর্জেন্টিনার দূরদর্শী ম্যানেজার কার্লোস বিলার্দো এক অভিনব সমস্যায় পড়েন। ইংল্যান্ড সেই ম্যাচে তাদের ঐতিহ্যবাহী অল-হোয়াইট বা সাদা জার্সি পরে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে নিয়ম অনুযায়ী আর্জেন্টিনাকে পরতে হতো তাদের অ্যাওয়ে বা বিকল্প গাঢ় নীল রঙের জার্সি। কিন্তু সমস্যা ছিল, আর্জেন্টিনার মূল নীল জার্সিগুলো ছিল ভারী সুতি কাপড়ের (Thick Cotton), যা মেক্সিকো সিটির তীব্র ও ভ্যাপসা গরমে পরে ৯০ মিনিট খেলা ফুটবলারদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
তেপিতোর ফুটপাথ থেকে এলো ম্যারাডোনার জার্সি!
এই সংকটের সময় ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসেন আর্জেন্টিনার ব্যাক-আপ গোলরক্ষক হেক্টর জেলাদা। মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকার হয়ে দীর্ঘ এক দশক খেলার সুবাদে মেক্সিকো সিটি তাঁর চেনা ছিল। তিনি পরামর্শ দেন শহরের ‘তেপিতো’ নামের একটি সস্তা ও কুখ্যাত বাজারে খোঁজ নেওয়ার, যেখানে সব ধরণের জাল বা নকল (Counterfeit) জিনিসপত্র বিক্রি হতো।
কোচের নির্দেশে সেখান থেকে আর্জেন্টিনার কিট প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘লে কক স্পোর্টিফ’ (Le Coq Sportif)-এর লোগোযুক্ত বেশ কিছু হালকা পলিয়েস্টার নীল জার্সি কিনে আনা হয়। লোকগাথা অনুযায়ী, বাজার থেকে দুটি ভিন্ন ডিজাইনের নকল জার্সি এনে অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনার সামনে রাখা হলে, তিনি নিজেই একটি নকশা পছন্দ করে বলেন, “এই জার্সিতেই আমরা ইংল্যান্ডকে হারাবো।”

রাতারাতি চললো সুঁই-সুতোর যুদ্ধ
ফুটপাথ থেকে কেনা সেই সাধারণ রেপ্লিকা জার্সিগুলোকে ফিফা বিশ্বকাপের মানে উন্নীত করতে তখন শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশনের (AFA) অফিশিয়াল লোগো এবং খেলোয়াড়দের নম্বরগুলো রাতারাতি জার্সির ওপর বসানোর কাজ শুরু করেন দলের কিটম্যানরা। কোনো রকম নিখুঁত করার চিন্তা বাদ দিয়ে, ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে ইস্ত্রি ও সেলাইয়ের মাধ্যমে জার্সিগুলো খেলার উপযোগী করা হয়।
ফুটপাথের জার্সি থেকে কোটি টাকার ইতিহাস
সেই নকল জার্সি পরেই মাঠে নেমে ইতিহাস গড়ে আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং পরে পুরো ইংল্যান্ড রক্ষণভাগকে একাই বোকা বানিয়ে করা সেই অতিমানবীয় একক গোলের ওপর ভর করে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে ম্যাচটি জেতে। ইংল্যান্ড বধের পর সেমিফাইনালে বেলজিয়াম এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে আর্জেন্টিনা।
পরবর্তীতে এই সাধারণ নকল জার্সিটিই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান স্মারকে পরিণত হয়। ২০২২ সালে একটি নিলামে ম্যারাডোনার পরা সেই কোয়ার্টার ফাইনালের নীল জার্সিটি রেকর্ড ৮.৯৩ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি) বিক্রি হয়েছিল!

প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত তথ্য:
১. তেপিতো বাজারের বর্তমান অবস্থা: মেক্সিকো সিটির সেই ‘তেপিতো’ বাজারটি আজও বিশ্বের অন্যতম বড় পাইরেসি ও ব্ল্যাক মার্কেট হিসেবে পরিচিত। ম্যারাডোনার এই গল্পের পর থেকে ফুটবল ভক্তদের কাছে এই বাজারটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
২. ১৯৮৬-র ফাইনাল বলের নিলাম: শুধু মারাদোনার জার্সিই নয়, ওই ম্যাচের তিউনিসিয়ান রেফারি আলী বিন নাসেরের কাছে থাকা ঐতিহাসিক বলটিও ২০২২ সালে প্রায় ২.৪ মিলিয়ন ডলারে নিলামে বিক্রি হয়েছিল।
৩. মেক্সিকোর হ্যাটট্রিক রেকর্ড: ২০২৬ বিশ্বকাপের মাধ্যমে মেক্সিকো বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তিনবার (১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬) বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করার অনন্য গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে।
আপনার কি মনে হয় আধুনিক ফুটবলের কর্পোরেট দুনিয়ায় ফুটবলারদের জার্সি নিয়ে ১৯৮৬ সালের মতো এমন কোনো নাটকীয় বা রোমাঞ্চকর ঘটনা কি ২০২৬ বিশ্বকাপে আবার দেখা যাওয়া সম্ভব?
