নবপ্রকাশ ডেস্ক:
কোথাও ঢাকের গগনবিদায়ী আওয়াজ, কোথাও কাঁসি, ঢোল, সানাই, মন্দিরা আর বাঁশির মিশ্র সুরের মুর্ছনা—শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসেছে দেশের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাট’। গত মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া ব্যতিক্রমী ও লোকজ ঐতিহ্যের এই হাটের আনুষ্ঠানিক পর্দা নামছে আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যায়। বলা হয়ে থাকে, দেশের একমাত্র জীবিত ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট এটিই।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় মহাষষ্ঠী থেকে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতায় ঢাকের শব্দ অপরিহার্য। পূজা সামনে রেখে বাড়তি উপার্জনের আশায় ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, সুনামগঞ্জ, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরা এসে সমবেত হয়েছেন এই কটিয়াদী পুরোনো বাজারের হাটে। অন্যদিকে সেরা ঢাকি ও বাদক দলকে নিজেদের মণ্ডপে নিয়ে যেতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন পূজা উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিরা।
৫০০ বছরের সুপ্রাচীন ইতিহাস
কটিয়াদীর এই হাটের ইতিহাস প্রায় অর্ধসহস্রাব্দের পুরোনো। স্থানীয় লোকগাথা অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীতে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় উপজেলার চারিপাড়া গ্রামের রাজপ্রাসাদে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। সেই পূজায় বাজনা বাজাতে বিক্রমপুর (মুন্সীগঞ্জ) থেকে নৌপথে অসংখ্য ঢাকি ও বাদক দল পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ‘যাত্রাঘাট’ নামক স্থানে নামেন। রাজা স্বয়ং ঘাটে এসে সবার বাজনা শুনে সেরা দলটিকে বেছে নিতেন। রাজপ্রথার অবসান হলেও কালক্রমে যাত্রাঘাট থেকে স্থান পরিবর্তিত হয়ে কটিয়াদী বাজারে স্থায়ী রূপ নেয় ঐতিহ্যবাহী এই ‘ঢাকের হাট’, যা আজ এ অঞ্চলের অন্যতম লোকজ সংস্কৃতির অংশ।
দক্ষতার বিচারে দরদাম ও বায়না
হাটে ঘুরে দেখা যায়, বাদক দলগুলো নিজেদের বাদ্যযন্ত্রের নৈপুণ্য ফুটিয়ে তুলতে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন। তাদের বাদ্যের তালে তাল মিলিয়ে চলছে দরদাম। কয়েকজন বাদক দলের সাথে কথা বলে জানা যায়, সদস্যদের সংখ্যা ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে পূজার দিনগুলোর জন্য চুক্তি হয়। সাধারণত সাধারণ একটি দলের বায়না ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে খ্যাতিমান দলের ক্ষেত্রে তা ১ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।
দোহারের নবাবগঞ্জ থেকে আসা বাদক দলনেতা সুজন মালাকার জানান, “এবার দেশজুড়ে পূজার সংখ্যা বেশি হওয়ায় আমাদের চাহিদাও বেশ ভালো। অনেকেই ৪০ হাজার টাকা বলছেন, তবে ভালো দল হওয়ায় আমরা ৬০ হাজার টাকার নিচে যাব না।” একই কথা জানান নরসিংদীর মনোহরদীর ফারুক মিয়া, যার দল ১ লাখ টাকার চুক্তিতে বায়না হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে পূজা মণ্ডপের জন্য ঢাকি কিনতে আসা উৎপল কুমার বলেন, “এই হাটে এলে একসঙ্গে শত শত দক্ষ ঢাকি পাওয়া যায়। বাজনা সামনাসামনি পরখ করে পছন্দমতো চুক্তিতে নেওয়ার সুবিধা অন্য কোথাও নেই। তাই প্রতি বছরই কটিয়াদীতে আসি।”
শারদীয় দুর্গোৎসব ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা জানান, বাদ্যক ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পূজার আয়োজকদের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশেই ঢাকের হাটের কেনাবেচা সম্পন্ন হচ্ছে।
