ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিতে দেশ

স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিতে দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে একদিকে সংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়ছে, অন্যদিকে অসংক্রামক রোগও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত এক বছরে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ২৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে যক্ষ্মা, এইচআইভি, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরসহ অন্তত ২৬টি রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে রোগের সংক্রমণ বাড়ার পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী।

টিকাদান ব্যাহত, বাড়ছে সংক্রমণ ঝুঁকি

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দীর্ঘদিন ধরে গ্যাভির সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। তবে হঠাৎ করে ওপি থেকে বেরিয়ে আসা এবং পরে তা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় কয়েক মাস টিকা সরবরাহ ব্যাহত হয়।

এর ফলে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহু শিশু নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকার পূর্ণ বা আংশিক ডোজ পায়নি। এতে হাম, পোলিও, নিউমোনিয়া ও ডিপথেরিয়ার মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ইপিআই কর্মকর্তারা জানান, শিশুদের সাত ধরনের টিকার মাধ্যমে ১১টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। এর মধ্যে বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, পোলিও, পিসিভি, এমআর, টিসিভি ও রোটাভাইরাস টিকা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব টিকার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বন্ধ হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি

শুধু টিকাদান নয়, একাধিক জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচিও বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেছে।
২০২৫ সালের মার্চে সর্বশেষ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হলেও এরপর আর কোনো কার্যক্রম হয়নি। এতে শিশুদের রাতকানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, যার আওতায় বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হতো, সেটিও এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে কৃমি সংক্রমণ ফের বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, অর্থসংকটের কারণে ২০২৪ সাল থেকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়ে। দেশে এখনো ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়াপ্রবণ হলেও মশারি বিতরণ, রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু জরিপ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

কালাজ্বর ও এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে শঙ্কা

কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে গত ১৮ বছরে অর্জিত সাফল্যও এখন হুমকির মুখে। প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটি পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া, গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তায় পরিচালিত এইচআইভি শনাক্তকরণ কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিট সরবরাহে ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

মন্ত্রীর বক্তব্য: দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “বিগত দুই সরকারের পরিকল্পনার ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যখাত ঝুঁকিতে পড়েছে।”

তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে টিকা সংগ্রহ করে পুনরায় ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে ৬ লাখ কিট সরবরাহ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সাপের কামড় প্রতিরোধে হাসপাতালে এন্টিভেনম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও আইসিইউ সংখ্যা বাড়ানো, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ কয়েক গুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং নীতিগত অসংগতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও তা যথাযথ ফল দিচ্ছে না।

তাদের মতে, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, বন্ধ কর্মসূচিগুলো পুনরায় চালু করা এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন না করলে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে।

সবমিলিয়ে, বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশের স্বাস্থ্যখাত এখন চরম ঝুঁকিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে