নবপ্রকাশ ডেস্ক:
টিসিবির পণ্যের ট্রাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইন, পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফেরা, ভূয়া ফ্যামিলি কার্ড এবং ডিলারদের কারসাজিতে গরিবের ভর্তুকির পণ্য খোলা বাজারে পাচারের মতো বহুল আলোচিত জটজাল কাটাতে বিশাল প্রযুক্তিগত রূপান্তরের পথ ধরেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। প্রচলিত কাগুজে কার্ড ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে চালু করা হয়েছে এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্যসংবলিত আধুনিক ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘উপকারী’ নামক একটি অল-ইন-ওয়ান ডিজিটাল মোবাইল অ্যাপ।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভায় টিসিবির এই ১০ ধাপের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপরেখা অনুমোদন করা হয়। সরকারি তথ্যমতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে দেশে প্রতি বছর অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা অপচয় ও ব্যাংক সুদ বাবদ সরাসরি সাশ্রয় হবে।
বাদ পড়ল ৫৯ লাখ ভুয়া আবেদনকারী, যুক্ত হলো এআই ও পস প্রযুক্তি
টিসিবি সূত্রে জানানো হয়েছে, এনআইডি ও ই-কেওয়াইসি (e-KYC) যাচাইকরণের মাধ্যমে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ থেকে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য, ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আবেদনকারীকে তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে ৫৭ লাখ নতুন স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি মোট ১০টি ধাপে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সুরক্ষিত ডিজিটাল কার্ড, সেলফ অ্যাক্টিভেশন, অনলাইন ডিলার ব্যবস্থাপনা, রিয়েল-টাইম এআই মনিটরিং, অল-ইন-ওয়ান পস (POS) মেশিন এবং ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপ।
এখন থেকে ডিলাররা পস ডিভাইসের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে তাৎক্ষণিক ডিজিটাল রসিদ দেবেন এবং এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে টিসিবির প্রধান কার্যালয় থেকে এক ক্লিকেই জানা যাবে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কত কেজি ডাল, তেল বা চিনি বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া ডিলারশিপ প্রথা বাতিল করে স্বচ্ছ লটারির মাধ্যমে অনলাইন পোর্টালে নতুন ডিলার নিয়োগ শুরু হয়েছে। টিসিবির পুরো এই সফটওয়্যার ও আইটি কাঠামোর রূপান্তর বাস্তবায়ন করছে ‘স্পেকট্রাম আইটি সলিউশনস লিমিটেড’।
যেভাবে সাশ্রয় হবে ৩৫০ কোটি টাকা
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, টিসিবির সমন্বিত ইআরপি (ERP) ব্যবস্থার কারণে এখন মাসের শুরুতেই ডিলারদের কাছ থেকে পণ্য বিক্রির অর্থ সরাসরি টিসিবির কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্টে চলে আসবে। ফলে পণ্য ক্রয়ের জন্য ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হবে না, যা একাই প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ব্যাংক সুদ বাঁচাবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ওয়্যারহাউস ও নিজস্ব গুদাম ব্যবস্থাপনার দক্ষতায় আরও ১০০ কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় ঘটিয়ে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে টিসিবির উপপরিচালক ও মুখপাত্র শাহাদত হোসেন জানান, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে টিসিবির বার্ষিক বিপুল পরিমাণ এসএমএস খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে টিসিবিকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল ও ভর্তুকিমুক্ত করার পথ সুগম হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ক্যাবের অভিনন্দন ও সতর্কতা
টিসিবিকে বিশ্বমানের প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে আখ্যা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন এবং সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে তীব্র মূল্যস্ফীতির এ সময়ে প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই স্বচ্ছতা জরুরি ছিল।
তবে নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সতর্ক করে বলেন, কেবল প্রযুক্তি আনলেই শতভাগ দুর্নীতি রোধ হয় না। প্রযুক্তির পেছনে থাকা মানবসম্পদ দুর্নীতিমুক্ত না হলে বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কঠোর তদারকি না থাকলে সিস্টেমে গলদ থেকে যেতে পারে। তাই মাঠপর্যায়ে প্রকৃত নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে কার্ড ও পণ্য পৌঁছানো নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জোরদার রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
