জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে সংবিধান সংশোধনে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটি। ক্ষমতাসীন জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এ কমিটির ডাকে সাড়া দেবে না গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংস্কারের দাবিতে অনড় বিরোধী দল।
আজ রোববার দুপুর আড়াইটায় সংসদে হবে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর সঙ্গে সংবিধান সংশোধন কমিটির এ বৈঠক।
সনদে সই না করা চার বামপন্থি দলকে আমন্ত্রণ জানায়নি কমিটি। দলগুলো হলো গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের শরিক চারটি দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাসদ ও বাসদ (মার্ক্সবাদী)।
জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া খেলাফত মজলিস জানিয়েছে, তারাও সংস্কারের দাবিতে অনড়। তাই কমিটির বৈঠকে যাবে না। রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন জানিয়েছে, তারা বৈঠকে গিয়ে সংবিধান সংশোধন নয়; গণভোটের ফল অনুযায়ী সংস্কারের দাবি জানাবে। জেএসডি জানিয়েছে, বিএনপি গণভোটে অস্বীকার করায় তারা কমিটির বৈঠকে অংশ নেবে না।
চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে ইসলামী আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ জানিয়েছেন, তারা বৈঠকে যাবেন না। ইসলামী আন্দোলন গণভোটের রায়ে সংস্কার চায়।
সনদে স্বাক্ষরকারী বাকি দলগুলো ক্ষমতাসীন বিএনপির সমমনা। সংস্কার প্রশ্নে দলগুলোর অবস্থান ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি। তারা আজকের বৈঠকে যোগ দেবে।
দুপুর ১২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জামায়াত, এনসিপি ছাড়াও এ জোটের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এলডিপি, এবি পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ও লেবার পার্টি সনদে সই করেছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ঐকমত্য কমিশন ৩৭টি দলকে সংস্কারের সংলাপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ৩৩টি দল এতে অংশ নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত অঙ্গীকারনামায় মতামত দেয় ৩০টি দল। বাহাত্তরের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে সনদে সই করেনি সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ।
গত বছরের ১৮ অক্টোবর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ড. ইউনূসের উপস্থিতিতে এই সনদ সই করে ২৪টি দল। পরবর্তী সময় সই করে গণফোরাম। বাস্তবায়ন পদ্ধতি তখনও নির্ধারিত না হওয়ায় এনসিপি সই করেনি। তারা নির্বাচনের তিন দিন পর ১৫ ফেব্রুয়ারি সনদে সই করে।
জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নির্ধারণে গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এই আদেশের ওপর গণভোট হয় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিন। এই আদেশে বলা হয়েছিল, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই পরিষদ ১৮০ দিনের মধ্যে গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করবে।
আদেশে বলা হয়েছিল, হ্যাঁ জয়ী হলে জুলাই সনদে বর্ণিত উপায়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতাসহ ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, সিএজি, পিএসসি, দুদকসহ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে হবে। এগুলো বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বাকি ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দল ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলোও বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক আদেশ অনুযায়ী। বাকি সংস্কার প্রস্তাবগুলো নির্বাচনে বিজয়ী দল তাদের নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) অনুযায়ী করতে পারবে।
জামায়াত, এনসিপি সরাসরি হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শেষ সময়ে গণভোটে হ্যাঁ চান। গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুমোদিত হয়। জামায়াত জোট ও ইসলামী আন্দোলনের ৭৮ এমপি শপথ নেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের। তবে বিএনপি জোট ও স্বতন্ত্র এমপিরা শপথ নেননি। সরকার গঠনের পর বিএনপি জানায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ছিল অবৈধ। দলটি গণভোট অধ্যাদেশও পাস করায়নি। তবে নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলছে।
এ জন্য সংসদে ১৭ সদস্যের সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে। এতে জামায়াত জোটকে পাঁচজন সদস্য দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। তবে এতে সাড়া না দিয়ে সংবিধান সংস্কার চাইছে জামায়াত। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগটি প্রতারণা। নির্বাচনের আগে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, গণভোটের ফল মেনে নেওয়া হবে। বিএনপিই গণভোটের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু হেরে এখন সংস্কার মানতে চাইছে না। তাই সংশোধন নামের প্রতারণায় জামায়াত অংশ নেবে না।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী জানান, তাদের দলের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক বৈঠকে যোগ দেবেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানান, তিনি নিজে ও দলের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য বহ্নিশিখা জামালী সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে যাবেন। তারা দুজনই দলের পক্ষে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে আমরা ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকগুলোতে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের কী কারণে সংবিধান সংশোধনী কমিটির বৈঠকে ডাকা হলো না, জানা নেই। তবে আমরা মনে করি, এ বিষয়ে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর সবার সঙ্গেই আলাপ-আলোচনা ও সবার মত শোনা উচিত।’
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, এর আগে সংসদেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংসদের বাইরে ও ভেতরে সব দলের মতামত নেওয়া হবে। এখন যখন আমাদের ডাকা হয়নি, তখন মনে হচ্ছে বিষয়টি তারা নিজেরাই আলোচনা করে ঠিক করতে চান।
একসময় বিএনপির সঙ্গে থাকা জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহিদউদ্দিন মাহমুদ স্বপন সমকালকে বলেছেন, গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হতে হবে। সংশোধনে কোনো আলাপ জুলাই সনদে ছিল না। জেএসডি তাই বৈঠকে যাবে না। বিএনপি সংশোধনের নামে যা করতে চাইছে, তাতে সংবিধানে স্বৈরাচার হওয়ার সব পথ খোলা হবে। এতে অংশ হবে না জেএসডি।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া সমকালকে বলেছেন, তারা বৈঠকে যাবেন। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কারের দাবি জানাবেন। কথা বলার সুযোগ না পেলে চলে আসবেন।
