ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » ভারতীয় শেয়ারবাজারে বড় ধস: নেপথ্যে ৫ কারণ

ভারতীয় শেয়ারবাজারে বড় ধস: নেপথ্যে ৫ কারণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

বিশ্বজুড়ে চরম জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধি, শুল্ক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও ভারতের সার্বিক অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। তবে দেশটির অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগোলেও সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে শেয়ারবাজারে। ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ ও প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর মধ্যে পারফরম্যান্সের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে নেমে এসেছে ভারতের শেয়ারবাজার।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, টানা আট সপ্তাহ টানা পতন ও মন্দাভাবের পর ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রধান শেয়ারসূচক সেনসেক্স ও নিফটি চলতি সপ্তাহের সোমবার থেকে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হলেও সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। শেয়ারবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে এটিই ছিল ভারতীয় বাজারের দীর্ঘতম ও ধারাবাহিক বড় ধস।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ যেসব ভারতীয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী (রিটেইল ইনভেস্টর) নিফটিতে বিনিয়োগ করেছিলেন, চলতি বছর শেষে তাদের গচ্ছিত সম্পদ প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অথচ একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি (Kospi) সূচকে অর্থ বিনিয়োগ করা হলে বিনিয়োগকারীরা ৬২ শতাংশ এবং গত দুই বছরে প্রায় ১৭০ শতাংশ রিটার্ন পেতেন।

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধসের চিত্র আরও ভয়াবহ। মুনাফা তুলে নেওয়া বা শেয়ার বিক্রির হিসাব বাদ দিলে, গত এক দশকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজারে যে নিট অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন, বার্নস্টাইন রিসার্চের তথ্যমতে তা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কেবল গত দুই বছরেই বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (এফআইআই) ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ—প্রায় ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের পুঁজি তুলে নিয়েছেন।

এই মহামন্দার মাঝেও মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে সাধারণ ও দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্রমাগত বিপুল মূলধন প্রবাহ বাজারকে সম্পূর্ণ ধসে পড়া থেকে রক্ষা করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক মিউচুয়াল ফান্ডে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ সম্পদের পরিমাণ ২০১৬ সালের ১২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বহুগুণ বেড়ে চলতি বছর প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ভারতে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে যুক্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে ১৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

উদ্যমী অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও ভারতের শেয়ারবাজারের এই চরম বিপর্যয়ের নেপথ্যে মূলত ৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা:

১. মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত সংঘাত ও জ্বালানি সংকট: কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি হরমুজ দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনা অষ্টম মাসে গড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ ডলারে ওঠানামা করছে। ফ্র্যাঙ্কলিন টেম্পলটন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইন্ডিয়ার ফান্ড ম্যানেজার হরি শ্যামসুন্দর জানান, ভারত তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে। বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে তা ভারতে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে কোম্পানির মুনাফা ও মার্জিনে চরম চাপ ফেলে। একইসাথে তেল আমদানিতে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ালেও সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি ভারতের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

২. বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি: তেলের উচ্চমূল্যের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, যা সুদের হারকে ঠেলে দিচ্ছে ওপরের দিকে। মার্কিন সরকারি বন্ডের প্রকৃত মুনাফার হার (Yield) ৫ শতাংশের ওপরে উঠে ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত মার্কিন বন্ডের সুদের হার বাড়ায় বিদেশি পুঁজি ভারতীয় বাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ উদীয়মান খাত ছেড়ে মার্কিন বন্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

৩. রুপির ক্রমাগত মান অবনমন: ভারতীয় রুপি ডলারের বিপরীতে দ্রুত মান হারানোয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত রিটার্ন চরমভাবে কমে গেছে। গত এক দশকে নিফটি বার্ষিক গড়ে মাত্র ৬ শতাংশ ডলার রিটার্ন দিয়েছে—যা উদীয়মান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।

৪. শেয়ারের চড়া দর বা উচ্চ মূল্যায়ন: শেয়ারের দর অতীতের তুলনায় কিছুটা সমন্বিত হলেও কোম্পানির প্রকৃত আয়ের বিপরীতে ভারতীয় শেয়ারের মূল্যায়ন এখনও বেশ চড়া। যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দ্রুত মুনাফা বাড়াতে পেরেছে, সে জায়গায় ভারতীয় কোম্পানিগুলো দর অনুযায়ী পর্যাপ্ত আয় দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

৫. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা: ভারতের শেয়ারবাজারে আধিপত্য বিস্তারকারী বড় কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক পরিবর্তনের সাথে তাল না মিলিয়ে পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য আঁকড়ে ধরে আছে। তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান বার্নস্টাইনের নোটে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক কিংবা চীনের ডিপসিকের (DeepSeek) মতো এআই বিপ্লব তৈরিতে ভারত ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে উদীয়মান বিশ্বমানের আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর মূলধন ভারতে আকৃষ্ট হচ্ছে না।

সামনের দিনের গতিপথ

বাজার বিশ্লেষণী সংস্থা কেয়ারএজ (CareEdge)-এর মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল হলে ভারতে হয়তো কিছুটা বিদেশি মূলধন ফেরত আসতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত টানাপোড়েন ও উচ্চ জ্বালানি ব্যয় করপোরেট খাতের মুনাফায় বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকবে। আপাতত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত মাসিক এসআইপি (SIP) ফান্ডের ওপর ভর করেই খুঁড়িয়ে চলছে দেশটির শেয়ারবাজার।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে