ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা : বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা : বিশ্বব্যাংক

ডেস্ক রিপোর্ট, নবপ্রকাশ:

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা আর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের পরোক্ষ কিন্তু সুদূরপ্রসারী ধাক্কা এসে লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। যুদ্ধের প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; তা স্পর্শ করেছে শিল্পোৎপাদন, কৃষি, মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের সামগ্রিক জীবিকাকে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে এক সরবরাহজনিত অচলাবস্থায় পড়েছে দেশ। এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

চাকরি হারানোর আশঙ্কা ও দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বগতি

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির উদ্বেগজনক চিত্র। সেখানে বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপ—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত এবং সরকারের সংকুচিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে এমনিতেই নতুন কর্মসংস্থান আশানুরূপ হচ্ছে না।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ না থামলে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি থমকে যাবে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যেখানে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল, যুদ্ধের প্রভাবে তা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ, সংঘাতের কারণে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন। সংস্থাটির মতে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে প্রায় ১০ শতাংশ ভূমিকা থাকবে কেবল পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির।

জ্বালানি সংকট ও ভর্তুকির পাহাড়ি চাপ

বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। তবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ২০১৬ সালের শীর্ষ রেকর্ড থেকে ইতিমধ্যে ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির (LNG) ৫৫-৬০ শতাংশের উৎস মধ্যপ্রাচ্য।

যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় পেট্রোবাংলার ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির পাঁচটিতেই ‘ফোর্স মেজর’ (অনিবার্য দুর্ঘটনাজনিত স্থগিতাদেশ) ঘোষণা করতে হয়েছে। খোলা বাজারে (স্পট মার্কেট) এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠে গেছে, যা আগের মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি। সেপ্টেম্বরের সরবরাহের জন্য বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট ২৪ ডলারের বেশি দামে দুটি চালান কিনতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক হিসাব করেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ ২.৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা মোট জিডিপির ২.৮ শতাংশ। এতে করে শিক্ষা বা সামাজিক সুরক্ষার মতো অন্যান্য গুরুত্ত্বপূর্ণ খাতে সরকারি বরাদ্দ কাটছাঁটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদি জ্বালানির এই বাড়তি দাম ধাপে ধাপে ভোক্তার ওপর চাপানো হয়, তবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যেতে পারে।

তবে সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, গত জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

কৃষিতে অশনিসংকেত: সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার ঝুঁকি

দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের রুটি-রুজির প্রধান উৎস কৃষি খাত। তবে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে সার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিরই উৎপাদন গ্যাস সংকটে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৯১.৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের অর্ধেকেরও বেশি। দেশে ইউরিয়ার দাম এরই মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদনে সরাসরি আঘাত হানবে।

স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা

জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটের ধাক্কা লেগেছে চিকিৎসাসেবাতেও। দেশের প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৬ হাজার২০০টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে পড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সেবা চালু রাখতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যয়বহুল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, যা দিনশেষে স্বাস্থ্যসেবার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ ছাড়া দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভর। পাশাপাশি হাসপাতালের ৯০ শতাংশের বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আনতে হয়। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসাসামগ্রী এবং ওষুধের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়ছে।

বিশ্লেষকের মতামত

পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাব আমরা কর্মসংস্থানে দেখতে পাচ্ছি। শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ। কোথাও কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার জ্বালানি ও সংকটের কারণে কোনো কোনো কারখানা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে সংকট কতটা গভীর। বিশ্বব্যাংক যে ৬ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, তা বর্তমান বাস্তবতারই এক প্রতিফলক।”

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বহুমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সংকট দ্রুত নিরসন না হলে এ টানাপোড়েনের চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে দেশের নিম্ন ও সীমিত আয়ের শ্রমজীবী মানুষকে।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে