ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » বন্যার জন্য অপরিকল্পিত বাঁধকে দুষছেন হাওরের কৃষকরা

বন্যার জন্য অপরিকল্পিত বাঁধকে দুষছেন হাওরের কৃষকরা

নবপ্রকাশ প্রতিবেদন:
হাওরের মানুষের দুঃখের শেষ নেই। বৃষ্টির কারণে ক্ষেতের ফসল ডুবে গেছে । পুরো এলাকা জুড়ে এখন পচা ধানের গন্ধে টিকে থাকা দায়। আকাশে রোদের দেখা মিলছে না। ফলে যারা কিছুটা ধান কেটেছে তারাও শুকাতে পারছে না। তবে টানা ৫ দিন পর বৃহস্পতিবার সূর্যের দেখা মিলেছে। কিন্তু এই রোদ কতটুকু সময় থাকে তাও বলা মুশকিল কারণ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্বস্তির খবর দিতে পারেনি। সংস্থাটি বলছে,গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে হাওর অঞ্চলে যে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেটির উন্নতি হতে সপ্তাহ পেরিয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হাওর এলাকায় নিমজ্জিত পাকা ধানের আশা ছেড়েই দিয়েছেন কৃষকরা। এসব জমিতে ধান পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। পানি কমলেও বেশির ভাগ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও যে যেভাবে পারছেন ধান কাটছেন। যে সময়টায় সোনালি ধানের ঘ্রাণ ভেসে থাকার কথা, সে সময়ে হাওরজুড়ে হতাশা আর পচা ধানের গন্ধ। মাঠজুড়ে নেই কোলাহল, প্রাণচাঞ্চল্য।
ছোট কৃষকরা নিজেদের ধান কেটে ঘরে তুলতে পারলেও, বড় কৃষকরা রয়েছেন বেশি বেকায়দায়। তাদের ধান কাটার কোন মানুষ নেই কাজ করারও মানুষ নেই। সামর্থ্যবান অনেক কৃষকের বাড়ি ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। সেগুলো ঠিক করারও মানুষ নেই।বাড়ির আশপাশে শুধু ধানপচা গন্ধ। খলায় স্তূপ করে রাখা ধানে চারা গজিয়েছে, পানির নিচে তলিয়ে গেছে পাকা ফসল, আর মাঠে নেমেও শ্রমিক মিলছে না। তারপরও কেউ থেমে নেই। বুকসমান পানিতে নেমে, কাদায় পা গুঁজে যে যেভাবে পারছেন ধান কাটছেন। কারণ, যা বাঁচানো যায়–সেটুকুই এখন ভরসা।
এই বোরো মৌসুমে বাংলাদেশের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদন করে থাকে কিন্তু আজকে সেই ধান যার গন্ধে তারা আনন্দ উপভোগ করত সেটা এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে রইল। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে এই বোরো মৌসুমে প্রায় ৫৪ শতাংশ ধান উৎপাদন হয় । সেই উৎপাদনের বেশিরভাগ ফসল নষ্ট হয়ে গেল।ক্ষতির প্রাথমিক তথ্যকৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কার্যালয় থেকে ক্ষতির তথ্য আসতে শুরু করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব বলছে, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরের সাত জেলাতেই চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ হয়েছিল ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ ২৫ হাজার টনের বেশি। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ হেক্টরের ধান কাটা গেলেও বাকিটা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
সুনামগঞ্জ শহরের খুব কাছেই একটি গ্রাম বুড়িস্থল। সেই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ইউপি সচিব শামছুল ইসলাম এখন বড় কৃষক হিসেবেই পরিচিত। মাঠে পচা খড় নাড়তে নাড়তে তিনি জানান, প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা খরচ করে শিয়ালমারা হাওরে ১০ একর ২৮ শতাংশ জমিতে চাষ করেছিলেন। সব জমিই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চার ফুট পানির নিচ থেকে এক একর জমির ধান কেটে আনার পর টানা বৃষ্টিতে সেই ধানেও চারা গজিয়েছে। এখন তা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, বাড়িতে রাখা দায় হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, তবুও উঠোনে শুকাইতেছি। কিছু না কিছু তো বাঁচাইতে হইবো। বুড়িস্থল গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবারের মধ্যে অন্তত অর্ধেকই একই অবস্থায় পড়েছেন। শিয়ালমারা হাওরের জমি যাদের, তাদের প্রায় সবারই সর্বনাশ হয়েছে। তিনি এ অবস্থার জন্য অপরিকল্পিত উতারিয়া বাঁধকে দায়ী করেন।
সুনামগঞ্জের বাওনের মাঠের কৃষকরা জানান জানান, এখন মাত্র ২৮ শতাংশ জমির ধান কেটে আনার চেষ্টা করছেন। বাকিটা আর তোলার উপায় নেই।তাদের দাবি, ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষি বাঁচাতে হলে শিয়ালমারা হাওরের জন্য কার্যকর পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হবে। দেখার হাওরের উতারিয়ায় রাবার ড্যাম নির্মাণ, হামহামিয়া খালে জলকপাট স্থাপন এবং বাওনের হাওরের জলাবদ্ধতা দূর করার উদ্যোগ জরুরি।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলার ১২ উপজেলার ১৯৯টি ছোট-বড় হাওরের প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে মাত্র ৫১ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া হাওরে দেখা গেছে, আধাপাকা ধান পানির নিচে। কেউ বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন, কেউ শ্রমিকের খোঁজে ছুটছেন। বর্তমানে শ্রমিক সংকট ধান কাটার জন্য আরো সমস্যায় ফেলে দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জের হাওরেও ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার কৃষক। ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও করিমগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও শ্রমিক দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে, কোথাও পানির নিচ থেকে ধান তুলে খলায় শুকানোর চেষ্টা চলছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ১২০০ টাকার বেশি, অথচ ধানের দাম কমে গেছে। ফলে কৃষকের লোকসান আরও বাড়ছে। করিমগঞ্জের চামটা নৌবন্দরের এক জ্বালানি ব্যবসায়ী জানান, আগে ধান কাটা মৌসুমে প্রতিদিন ১৮ হাজার লিটার ডিজেল বিক্রি হতো, এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কারণ, হারভেস্টার ও মাড়াইকল ঠিকমতো চলছে না।
মৌলভীবাজারের হাওরেও ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। জেলার প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমির ফসল প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৮ হাজার কৃষক। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পাহাড়ি ঢলে ৪৪৩ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। জামবিল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকেরা পানির নিচ থেকে ধান কেটে উঁচু জমিতে রাখছেন। হালুয়াঘাটের কৃষক ফারুক বলেন, ৩৫ হাজার টাকা দিয়া জমি নিয়েছিলাম। চোখের সামনে ধান ডুবে গেল। আরেক কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, পাঁচ একর জমির সব ধান পানিতে গেছে। এখন সংসার চালাবো কীভাবে?
খুলনার ডুমুরিয়ায় ভিন্ন সংকট। সেখানে ফলন ভালো হলেও শ্রমিক সংকট ও ধানের কম দামে বিপাকে কৃষক। একদিকে বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলের জমি তলিয়ে গেছে, অন্যদিকে এক মণ ধানের দাম ৯৫০–১০০০ টাকা হলেও শ্রমিকের মজুরি ১২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে অনেকেই নারী শ্রমিক দিয়ে কম খরচে ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
সরকারের চলতি বছরের সংগ্রহ নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত বছরের মতোই ধান-চালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এতে কৃষক লোকসানে পড়বেন। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য মূল্য সহায়তা (প্রাইস সাপোর্ট) অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশে ধানের উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসে এই ঘাটতি সাড়ে ৭ শতাংশ ধরা হলেও বাস্তবে তা ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কারণ, দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৪ শতাংশই আসে বোরো মৌসুম থেকে, যার বড় অংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চলে।
কৃষিবিদরা বলেন, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ করে পুনর্বাসন ও প্রণোদনা সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি যেসব এলাকায় এখনও ধান পুরোপুরি তলিয়ে যায়নি, সেখানে সরকারি উদ্যোগে কম্বাইন হারভেস্টার ও অতিরিক্ত শ্রমিক পাঠিয়ে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ মওকুফ, বিনাসুদে নতুন ঋণ, বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতি বছরের পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং হাওর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও পরিবারকে খাদ্য ও নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সচিব ড. রফিকুল আই মোহাম্মদ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি উপজেলায় অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্য জেলা থেকে ধান শুকানোর ড্রায়ার মেশিন এনে হাওরে পাঠানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো কৃষক সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।

 

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে