জহিরুল ইসলাম রাতুল: রাজধানী ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনায় ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে ইতিবাচক পরিবর্তন। এক সময় যেখানে ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করা, জেব্রা ক্রসিং দখল করে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে বেপরোয়া যান চলাচল ছিল সাধারণ ঘটনা, সেখানে এখন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার কারণে চালকদের আচরণে আসছে লক্ষণীয় পরিবর্তন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে স্থাপিত আধুনিক ট্রাফিক সিগনাল, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং অটোমেটেড মনিটরিং সিস্টেম সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সংলগ্ন এস্কাটন রোডের প্রবেশমুখে দেখা যায় এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। ব্যস্ত নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়ে তখন কোনো ট্রাফিক পুলিশ দৃশ্যমান ছিল না। তবুও সিগনাল লাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একে একে থেমে যায় ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন। শুধু তাই নয়, কোনো গাড়ির চাকা জেব্রা ক্রসিং স্পর্শ করেনি। চালকেরা নির্ধারিত স্টপ লাইনের পেছনেই অবস্থান করেন এবং সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় থাকেন।
এক সময় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা যেত, সিগনাল লাল হওয়ার পরও যানবাহন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর উঠে যেত। এতে পথচারীদের রাস্তা পারাপারে ভোগান্তি সৃষ্টি হতো এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। কারণ চালকেরা জানেন, নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করলে শুধু ট্রাফিক পুলিশের হাতে ধরা পড়ার বিষয় নয়, স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার নজরদারিও এড়ানো সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আওতায় সিগনাল অমান্য করা, স্টপ লাইন অতিক্রম করা কিংবা জেব্রা ক্রসিং দখল করার মতো ঘটনাগুলো রেকর্ড করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে অনেক চালক এখন সচেতনভাবেই ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন। আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষিত হওয়ায় শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও কমে এসেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ শহরে সড়ক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হলো প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। সেখানে ট্রাফিক পুলিশ নয়, বরং প্রযুক্তিই নিয়ম মেনে চলতে মানুষকে বাধ্য করে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতির সূচনা ঘটছে। এর ফলে একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে, অন্যদিকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হচ্ছে।
ছবিতে দেখা যায়, সড়কের মাঝখানে সুশৃঙ্খল বিভাজক, আধুনিক ট্রাফিক সিগনাল, জেব্রা ক্রসিং এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যে নিয়ম মেনে দাঁড়িয়ে রয়েছে যানবাহন। আশপাশে উঁচু অবকাঠামো, মেট্রোরেল লাইন এবং নগরায়নের আধুনিক চিত্রের সঙ্গে এই ট্রাফিক শৃঙ্খলা যেন রাজধানীর পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
পথচারীদের মতে, এ ধরনের শৃঙ্খলা শুধু যান চলাচল নিয়ন্ত্রণেই নয়, পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যখন যানবাহন জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে থেমে থাকে, তখন মানুষ নির্বিঘ্নে রাস্তা পারাপার করতে পারে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে এবং নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সড়ক আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি অব্যাহত থাকলে রাজধানীর সড়কে আরও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে এস্কাটনের এই দৃশ্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন থাকলে নাগরিক আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব।
রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের এক কোণে শনিবার সন্ধ্যায় দেখা এই দৃশ্য তাই শুধু একটি ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি গাড়ির চিত্র নয়; বরং এটি আইন, প্রযুক্তি এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি নতুন ট্রাফিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। যা ভবিষ্যতের নিরাপদ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
