দেশে হামের সংক্রমণের জন্য বিগত দুই সরকার দায়ী: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক,কিশোরগঞ্জ:
দেশে সাম্প্রতিক হাম সংক্রমণের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিগত সময়ে স্বাস্থ্যখাতে চরম লুটপাট ও গাফিলতির কারণেই দেশে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (২৭ মে) দুপুরে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করেছি। আমাদের কাছে রাতারাতি কিছু করার মতো পর্যাপ্ত অর্থকড়িও ছিল না। এর মধ্যেই দেশে হামের সংক্রমণ দেখা দেয়।”
গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাস্থ্যখাতের টাকা লুটপাট হয়েছে। ইউনিসেফ, গ্যাভি (GAVI) এবং এডিবি (ADB) পাঁচবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে টিকা সংগ্রহ করা হয়নি। মূলত ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বেসরকারি উৎস থেকে হামসহ বিভিন্ন টিকা কেনা হয়েছিল।
ক্যাম্পেইন বন্ধ রাখা: নিয়মানুযায়ী প্রতি চার বছর পর পর এমআর (MR) টিকার ক্যাম্পেইন করার কথা থাকলেও, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর বিগত সরকারগুলো আর কোনো ক্যাম্পেইন করেনি। যার খেসারত বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে।
টিকা সংকটের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, ডোনার দেশগুলোর সহযোগিতায় সরকার দ্রুততম সময়ে হামের টিকা সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে। বৈশ্বিক ভ্যাকসিন জোট ‘গ্যাভি’-র কাছ থেকে জরুরি অনুরোধের মাধ্যমে ধার হিসেবে টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে, যার ফলে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
গত ৪ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় প্রথম দফায় কার্যক্রম শুরু হয়।
পরবর্তীতে ময়মনসিংহ, বরিশাল, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে এই কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হয়।
গত মাসের ২০ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশব্যাপী মূল ক্যাম্পেইন শুরু হয়ে তা সফলভাবে শেষ হয়েছে।
এই ক্যাম্পেইনের আওতায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্থাৎ ১০৩ শতাংশ (২ কোটিরও বেশি) শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ক্যাম্পেইন শেষ হলেও বর্তমানে দেশের প্রতিটি উপজেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য পরিকল্পনা নিয়ে মন্ত্রী জানান, হামের পর এবার ডেঙ্গু মোকাবেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সরকারিভাবে ইতিমধ্যে ১ লক্ষেরও বেশি ডেঙ্গু স্যালাইন মজুত করা হয়েছে, যেন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়লেও স্যালাইনের কোনো সংকট না হয়।
১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও গ্রামীণ প্রসূতি সেবা
জনবল সংকট দূরীকরণে আগামী জুলাই মাস থেকে বড় ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী বলেন:
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী জুলাই মাসের পর থেকে স্বাস্থ্যখাতে ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। যার মধ্যে ৮০ শতাংশই হবেন নারী।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, গ্রামীণ প্রসূতি মায়েদের দালালের খপ্পর ও অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন থেকে রক্ষা করতে প্রতিটি গ্রামে স্ট্যান্ডবাই কেয়ারগিভার ও মিডওয়াইফ রাখা হবে। মায়েদের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার ৪টি ধাপেরই সুনিশ্চিত সেবা নিশ্চিত করবে এই নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা।
মন্ত্রী জানান, দেশের ৭০ থেকে ১০০ বছরের পুরনো হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়নের জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। আগামী বাজেটে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতকে দ্বিতীয় বৃহত্তম বরাদ্দ দিচ্ছেন। ফলে আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের সব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও লজিস্টিকস সরবরাহ শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
হাসপাতাল পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুল হাসান মারুফ, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম এবং মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. মজিবর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
