ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
Home » সর্বশেষ » দক্ষিণ এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ: বাংলাদেশ-ভারত টানাপোড়েন, পাকিস্তানের প্রত্যাবর্তন এবং বদলে যাওয়া ভূরাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ: বাংলাদেশ-ভারত টানাপোড়েন, পাকিস্তানের প্রত্যাবর্তন এবং বদলে যাওয়া ভূরাজনীতি

মো. জহিরুল ইসলাম রাতুল: দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির দিকে আরও দৃশ্যমানভাবে এগোচ্ছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ, চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন এই অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ঢাকা-দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সংকট নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক কূটনৈতিক বাস্তবতার সূচনা, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন অংশীদার খুঁজছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। স্বাধীনতার পর নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে দুই দেশের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে গত দেড় দশকে আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ, বিদ্যুৎ আমদানি, রেল ও সড়ক সংযোগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছায়।
তবে একই সময়ে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকা, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা, বাণিজ্য বৈষম্য, ভিসা জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে পারস্পরিক অসন্তোষও জমতে থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে একটি দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন সরকার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা বললেও, বিভিন্ন কূটনৈতিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আগের মতো উষ্ণতা দেখা যায়নি।
বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে দুই দেশের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং কূটনৈতিক যোগাযোগে সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও আগের ঘনিষ্ঠতার পরিবর্তে এখন সম্পর্ক অনেক বেশি স্বার্থভিত্তিক এবং বাস্তববাদী বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল সীমিত এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। বাণিজ্য, ব্যবসা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর এবং বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদলের আদান-প্রদানও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে কোনো জোটে যোগ দিচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং এটি বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির অংশ, যেখানে সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে ভারতের একটি অংশে এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বলছে, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই অন্য দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।
বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চল এবং নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অংশগ্রহণ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের আগ্রহ এবং সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ভারত মনে করে, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে বাংলাদেশ বলছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে সব উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে কাজ করাই তাদের নীতি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি তিস্তা নদীর পানিবণ্টন। বহু বছর ধরে আলোচনার পরও চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সীমান্তে গুলি, চোরাচালান, মাদক, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান এখনও আসেনি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অমীমাংসিত বিষয় দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করেছে।
ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ ভারত থেকে জ্বালানি, কাঁচামাল, শিল্পপণ্য ও বিদ্যুৎ আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতে রপ্তানি করে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ চীন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য এবং পাকিস্তানসহ নতুন বাজারেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, তবে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতির বাস্তব প্রয়োগ আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
ঢাকা একই সঙ্গে ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাঝারি আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বর্তমান টানাপোড়েনকে অনেকেই সাময়িক কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করছে।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটারেরও বেশি স্থলসীমান্ত, বিস্তৃত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, আন্তঃনদী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগ—এসব কারণে দুই দেশ একে অপরের জন্য অপরিহার্য অংশীদার।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদি তা জাতীয় স্বার্থ, ইতিহাসের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাকে একই সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, চীন এবং অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসন, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত কিন্তু গঠনমূলক সহযোগিতা, চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগের সদ্ব্যবহার এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আগামী দিনের পথ নির্ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত নয়, বরং সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং বাস্তববাদী কূটনীতিই দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি হতে পারে।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে