মালয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটা যদি কোনোমতে প্রাণ বাঁচানোর পরীক্ষা হয়, তবে সিঙ্গাপুরের সামনে দ্বিতীয় ম্যাচটা ছিল খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু একটু করে আত্মবিশ্বাস কুড়ানোর চেষ্টা। কিন্তু আজ? ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় এই ম্যাচটি জাকার্তার বুকে বাংলাদেশের জন্য সান্ত্বনার কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়; এ যেন এক গনগনে ‘অগ্নিপরীক্ষা’! টুর্নামেন্টের আগেই যেখানে কোচ থমাস ডুলি র্যাঙ্কিংয়ের পরিসংখ্যানের চাদরে নিজেকে লুকিয়ে এক প্রকার সাদা পতাকা উড়িয়ে দিয়েছেন, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরা জামাল ভূঁইয়া মনে করিয়ে দিচ্ছেন– এই ইন্দোনেশিয়াকেই তো শেষ দেখায় রুখে দিয়েছিল লাল-সবুজ। ইউরোপের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিপক্ষ যতই বলীয়ান হোক, বাংলাদেশ ফুটবলের পোস্টারবয় হামজা চৌধুরীর চোখের মণি কাঁপছে অন্য এক জেদে; ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বুক ফুলিয়ে বলেছেন, চ্যালেঞ্জটা নিতেই তো হাজার মাইল পেরিয়ে জাকার্তায় আসা! এটা ঠিক যে, দুটি ম্যাচে চার-চারটি গোল হজম করার ক্ষত বুকে নিয়ে আজ মাঠে নামছে বাংলাদেশ। সেখানে নিজেদের নামের পাশে গোলসংখ্যা এখনও শূন্য। গোলমুখে বলার মতো একটা শট নেওয়ার জন্য যে হা-পিত্যেশ, তা আজ রূপ নিতে পারে এক অদম্য মরিয়া চেষ্টায়। আজ হয়তো রক্ষণ ভেঙে নিজেদের জালে আবার বল জড়াবে, হয়তো আরও একবার ব্যর্থতার গল্প লেখা হবে; কিন্তু এই ম্যাচটা সব হারানোর আগে বুক ভরে শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার। সমর্থকদের আজ একটাই প্রার্থনা, অন্তত একটা গোল করুক হামজারা! নিজেদের জাল অক্ষত রাখার চেয়েও আজ প্রতিপক্ষের বুকে অন্তত একটা মরণকামড় বসানোর তীব্র জেদ খেলা করছে জামাল-হামজাদের চোখেমুখে। অন্তত একটা গোল চাই– স্রেফ একটা গোল, যা মনে করিয়ে দেবে, বাঘ এখনও মরেনি! কিন্তু যে গোলের জন্য চাতক হয়ে আছে সবাই, সেই গোল করবে কে? ফরোয়ার্ডে থাকা রাকিব, শুকি নাকি মোরছালিন? নাকি ওপরে উঠে এসে স্পটকিকে হামজার মতো কেউ? নাকি শমিত সোমের কোনো জোরালো হেড সন্ধান দেবে সেই কাঙ্ক্ষিত গোলের? উত্তর জানা নেই কারও। তবে গতকাল জাকার্তায় সংবাদ সম্মেলনে কিছুটা যেন আত্মবিশ্বাসী দেখিয়েছে কোচ থমাস ডুলিকে। ‘অবশ্যই আমরা ম্যাচটি জিততে চাই। আমাদের দল অবশ্যই ওই লেভেলে খেলতে চায়। আমরা র্যাঙ্কিংয়ে দেড়শর কোঠায় যেতে চাই। আমাদের লড়াই করতে হবে, ইন্দোনেশিয়ার সামনে আমরা হারতেও পারি। তবে পারফেক্টটা করতে হবে। আমি মনে করি না, আন্ডারডগ বলেছি বলে খেলোয়াড়রা অনুপ্রাণিত নয়। এখন আমি কি বলব– আমরা ফেভারিট? আমরা এই খেলায় এক নম্বরে আছি? আমি ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে এগিয়ে আছি? আমাদের এখানে খেলার উদ্দেশ্য হলো শেখা এবং বাড়ি ফিরে সাফ জেতা।’ ইন্দোনেশিয়া দলটা যে এই আসরের ফেভারিট– তা মেনে নিতে দ্বিধা নেই কারও। দলটির স্কোয়াডে ১৭ জন বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়। যাদের কেউ কেউ স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে খেলে থাকেন। তারপরও তাদের একটা অস্বস্তি তাড়া করছে। আগের ম্যাচে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছে ইন্দোনেশিয়া। দলের মাঝমাঠের অন্যতম খেলোয়াড় থম হায়ে লাল কার্ড দেখায় আজকের ম্যাচে খেলতে পারবেন না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার ফুটবলে ইউরোপীয় ধাঁচ থাকার একটা প্রচলিত ধারণা আছে। সেই সঙ্গে নিজেদের ভরা গ্যালারি। ম্যাচে র্যাগনার ওরাতমাঙ্গোয়েদের পা থেকে নিখুঁত পাসের ফুলঝুরি ছোটে, তখন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ার জোগাড় হয়। কিন্তু এই পাহাড়প্রমাণ শক্তির আড়ালেও একটা চোরা দুর্বলতা লুকিয়ে আছে। অতিরিক্ত প্রেসিং ফুটবল খেলতে ওরা মাঝেমধ্যেই নিজেদের ডিফেন্সের দরজাটা হাঁ করে খোলা রেখে দেয়, যার প্রমাণ গত আগস্টে ভিয়েতনামের কাছে ৩-০ গোলের বড় ধাক্কা। জামালরা যদি ওদের এই অতি-আক্রমণাত্মক মানসিকতার সুযোগ নিয়ে প্রতি-আক্রমণে মরণকামড় বসাতে পারে, তবেই জাকার্তার এই দুর্গে ফাটল ধরানো সম্ভব। সেখানে মিড ব্লকে হামজা আর শমিত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। আর লো ব্লকের জন্য জায়ান, জিদান, তারিক আর সাদ তো রয়েছেনই।
