নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দেশে গৃহকর্মীদের শ্রম অধিকার, আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে রাজধানীতে জাতীয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুরুল ইসলাম চৌধুরী হলে “বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার জোরদারকরণ” শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্র (বিএনএসকে) এবং গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক (ডিডব্লিউআরএন)।
আয়োজকরা জানান, দেশের লাখো গৃহকর্মী পরিবার ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদান করলেও তারা এখনো শ্রমিক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কার্যকর আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবসকে সামনে রেখে গৃহকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা এবং সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়।
সভার আগে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, নারী অধিকারকর্মী, গৃহকর্মী প্রতিনিধি, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তি এবং কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন বন্ধের দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতি ও নগর জীবনের একটি বড় অংশ গৃহকর্মীদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল হলেও তাদের কাজ এখনো আনুষ্ঠানিক শ্রমের মর্যাদা পায়নি। ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের শোষণ, বৈষম্য ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের শিকার হচ্ছেন। গৃহকর্মীদের জন্য একটি কার্যকর আইন ও সুরক্ষা কাঠামো প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি বলে তারা মন্তব্য করেন।
পরে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিলস (BILS)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি প্রতিনিধি কাজি ফয়সাল বিন সিরাজ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শায়লা শার্মিন জামান।
সভায় সভাপতিত্ব করেন গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক আবুল হোসেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের শ্রমবাজারে গৃহকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন এখনো হয়নি। গৃহকর্মীদের জন্য বিদ্যমান নীতিমালা ও আইনি সুরক্ষা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তিনি গৃহকর্মীদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, গৃহকর্মীদের অধিকাংশই নারী হওয়ায় তারা কর্মক্ষেত্রে দ্বৈত বৈষম্যের শিকার হন। একদিকে শ্রমিক হিসেবে তাদের অধিকার নিশ্চিত হয় না, অন্যদিকে নারী হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও হয়রানির ঝুঁকিতে থাকতে হয়। তাই গৃহকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের আংশিক অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ সংশোধন এবং বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে গৃহকর্মীদের কর্মঘণ্টা, ছুটি, স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
সভায় আলোচকরা আরও উল্লেখ করেন যে, বিশেষ করে নারী ও অভিবাসী গৃহকর্মীরা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, অবমাননাকর আচরণ এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন। অভিযোগ করার সুযোগ সীমিত হওয়ায় এবং আইনি সহায়তা সহজলভ্য না হওয়ায় অধিকাংশ ঘটনা প্রকাশও পায় না। ফলে গৃহকর্মীদের জন্য জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানে গৃহকর্মী ফোরাম নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে গৃহকর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১০ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল গৃহকর্মীদের পূর্ণ শ্রমিক স্বীকৃতি প্রদান, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, লিখিত নিয়োগপত্রের ব্যবস্থা, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তি, কর্মস্থলে সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত ও কার্যকর আইনি প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করা।
বক্তারা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গৃহকর্মী বিষয়ক কনভেনশনের আলোকে জাতীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে শুধু একটি শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমানই উন্নত হবে না, বরং দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
সভায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধি, শ্রম অধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গৃহকর্মী প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা গৃহকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়নে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে বক্তারা বলেন, গৃহকর্মীরা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র এবং সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবসের মূল চেতনা বাস্তবায়নে গৃহকর্মীদের জন্য একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কার্যকর আইন, নীতিমালা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তারা।
