আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনঅসন্তোষ যখন তীব্র আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস ত্যাগের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রে তিনি সাধারণ আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করছেন না। তাঁর ভাষায়,
“আমি আমেরিকানদের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে মোটেও ভাবছি না। আমার কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র পেতে পারবে না।”
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা যখন যুদ্ধের ১১তম সপ্তাহে গড়িয়েছে, তখন ট্রাম্পের এই অবস্থান তাঁর প্রশাসনের অগ্রাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। তিনি বলেন,
“ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র পেয়ে যায়, তাহলে পুরো বিশ্ব বিপদের মুখে পড়বে। আমি অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ভাবছি না।”
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, “প্রত্যেক আমেরিকান বোঝে যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক শক্তিধর হতে দেওয়া যাবে না।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকে সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টিকে আপাতত গৌণ হিসেবে দেখাতে চাইছে। তবে সমালোচকদের মতে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটকে অগ্রাহ্য করে এমন মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতির হার আগের বছরের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় এবং আবাসন খরচ বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই ডেমোক্র্যাট নেতারা কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। সিনেটে বিরোধীদলীয় নেতা চাক শুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের মন্তব্য শেয়ার করে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, “আমরা বুঝতে পারছি।”
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলার নামে ট্রাম্প প্রশাসন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে উপেক্ষা করছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে বলে তারা দাবি করছে।

এবিসি নিউজ, ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোসের যৌথ জরিপে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেতিবাচক মনোভাবের চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী—
* প্রায় ৬৫ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি সমর্থন করছেন না।
* জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় তাঁর পদক্ষেপে অসন্তোষ জানিয়েছেন প্রায় ৭৫ শতাংশ নাগরিক।
* মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে তাঁর পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন।
* মুদ্রাস্ফীতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের ভূমিকাকে ‘ব্যর্থ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির প্রশ্নে জনসমর্থন কমে যাওয়া আগামী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্প উচ্চপর্যায়ের এক বিদেশ সফরে বের হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সফরের মূল উদ্দেশ্য ইরান সংকট এবং চীনের সঙ্গে চলমান ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা মোকাবিলায় কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদার করা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল গ্যাস ট্যাক্স সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়ও বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। যদিও সমালোচকদের মতে, এটি প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতিতে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত বহন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও পরমাণু নিরস্ত্রীকরণকে সামনে রেখে ট্রাম্প সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছেন। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ভোটারদের বড় অংশকে তাঁর বিপক্ষে ঠেলে দিতে পারে।
ফলে ইরান ইস্যুতে কঠোর অবস্থান ট্রাম্পের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করলেও, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
