আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আসন্ন শীত মৌসুমকে সামনে রেখে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও সামাজিক অবকাঠামো গুড়িয়ে দিতে পুনরায় ব্যাপক আকারের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। দেশটির নয়টি অঞ্চলে চালানো এই সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত আটজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৬০ জন আহত হয়েছেন। হামলার মুখে ধ্বংস হয়েছে দুটি বড় শপিং সেন্টার, একটি কাস্টমস টার্মিনালসহ বহু বেসামরিক স্থাপনা। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন।
গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) দিনজুড়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর এই সমন্বিত ও বিধ্বংসী আক্রমণ চালায় রুশ বাহিনী।
অঞ্চলভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি
ইউক্রেনীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, খারকিভ, ক্রামাতোরস্ক, ভোলিন, সুমি ও রিভনে অঞ্চলকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করে রাশিয়া।
পূর্বাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর খারকিভের গভর্নর ওলেহ সিনিয়েহুবভ জানান, শহরের তিনটি জেলায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭১ বছর বয়সী এক নারী ও ৫৮ বছর বয়সী এক পুরুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১২ জন। একইভাবে দোনেৎস্ক অঞ্চলের সম্মুখসারির শহর ক্রামাতোরস্কে দুজন এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে আরও দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
পোল্যান্ড সীমান্তসংলগ্ন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভোলিন অঞ্চলের একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় রুশ ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন গভর্নর রোমান রোমানিউক। এছাড়া কিয়েভ-পোল্যান্ড সংযোগকারী প্রধান সড়কের কোভেল শহরের একটি আন্তর্জাতিক কাস্টমস টার্মিনালে ড্রোন হামলায় আগুন ধরে অন্তত ১০টি পণ্যবাহী ট্রাক সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়।
রিভনে শহরের গভর্নর ওলেক্সান্দ্র কোভাল জানান, ড্রোন হামলায় শহরটির একটি সুবিশাল শপিং সেন্টার ও আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একজন নিহত ও সাতজন আহত হন। একই দিনে সুমি শহরের একটি জনবহুল শপিং সেন্টারেও বিমান হামলা চালায় রাশিয়া।
ব্ল্যাকআউট ও জ্বালানি খাতের বিপর্যয়
ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবারের হামলার পর ১০ লাখের বেশি পরিবার অন্ধকারে তলিয়ে গেলেও মেরামতী দলগুলো দ্রুত কাজ শুরু করে অনেক এলাকায় সংযোগ পুনর্বহাল করেছে।
ভোলিন অঞ্চলে আক্রান্ত প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার পরিবারের মধ্যে ১ লাখ পরিবারকে বিদ্যুৎ ফেরানো সম্ভব হয়েছে। তবে ভোলিনের রাজধানী লুটস্কের মেয়র আন্দ্রি রাজুমোভস্কি সতর্ক করে বলেছেন, শহরের বিদ্যুৎ বিভ্রাট অন্তত ২৪ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। রিভনে শহরের বিশাল একটি অংশ এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, ক্রেমলিনে রাশিয়ার সামরিক প্রধান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও জোরদার করার জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও সম্পদ বরাদ্দ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ ও আশঙ্কাজনক তথ্য
ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বাড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষক দলের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে ইউক্রেনে অন্তত ৩২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২,১০৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন—যা আগস্টের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ইউক্রেনে ২ হাজার ৫৭০ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৫ হাজার ২১১ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যা ২০২৫ সালের একই সময়ের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি এবং ২০২৪ সালের মোট সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।
ইউক্রেনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ড্যানিয়েল বেল পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “চলতি অক্টোবর ২০২৬-এর প্রথম দুই সপ্তাহ ছিল বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিকদের জন্য অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতী সময়।”
