দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে আবারও বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জ্বর, সর্দি, কাশি এবং শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে শিশুদের ভিড় বাড়তে দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবকের মধ্যে একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে—মায়ের বুকের দুধ কম খাওয়ানোর কারণেই শিশুদের মধ্যে হাম বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হলেও হাম প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম বা Measles একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেওয়ার মাধ্যমে রোগটির লক্ষণ প্রকাশ পায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এ রোগ কখনও কখনও গুরুতর আকার ধারণ করে। নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, ডায়রিয়া এমনকি মস্তিষ্কে জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, মায়ের বুকের দুধ শিশুর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস। বুকের দুধে থাকা অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য আদর্শ খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। এটি ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
তবে চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুকের দুধ শিশুকে সম্পূর্ণভাবে হাম থেকে রক্ষা করতে পারে না। অর্থাৎ, বুকের দুধ কম খেলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র এ কারণেই হাম হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে হাম বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সময়মতো টিকা না নেওয়া। অনেক অভিভাবক এখনো শিশুদের নির্ধারিত সময়ে এমআর (Measles-Rubella) টিকা দিচ্ছেন না। পাশাপাশি অপুষ্টি, ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা, জনবহুল পরিবেশে বসবাস এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবও হাম সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের বিনামূল্যে এমআর টিকা দেওয়া হয়। এই টিকা হাম প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। নির্ধারিত সময়ে টিকা গ্রহণ করলে হাম হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে অভিভাবকদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। জন্মের পর থেকে শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো, প্রথম ছয় মাস এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং নিশ্চিত করা এবং সময়মতো হাম বা এমআর টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শিশুকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখা এবং আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গুজবের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও অবহেলার কারণে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
সবশেষে স্বাস্থ্যসচেতন মহল বলছে, মায়ের বুকের দুধ শিশুর সুস্থ বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে হাম প্রতিরোধের মূল হাতিয়ার হলো টিকা। তাই শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বুকের দুধের পাশাপাশি সময়মতো টিকাদান এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
রাকিবুল আহসান
রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট
