ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
Home » সর্বশেষ » সরকারের কাছে ১৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি

সরকারের কাছে ১৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি

নবপ্রকাশ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হুহু করে বাড়ায় বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের কাছে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি ভর্তুকি চেয়েছে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার ওপরই মূলত বিপিসির লাভ-লোকসান নির্ভর করে। দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি, মজুত, বিপণন, বিতরণ সংক্রান্ত সব কার্যক্রম তত্ত্বাবধান, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের একমাত্র সরকারি সংস্থা এটি।

গত কয়েক বছর বিশ্ববাজারে তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় জ্বালানি তেল বিক্রি করে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করে আসছিল সংস্থাটি। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের উত্তাপে আর্থিক চাপে পড়ে বিপিসি। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধের ফলে সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তর তর করে বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম। তবে ওই সময় দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে অপরিবর্তিত রাখা হয়। একইভাবে এপ্রিলের শুরুতেও দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও ১৯ এপ্রিল হুট করে সবধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার।

এ মূল্যবৃদ্ধির আগে জ্বালানি তেল বিক্রয়ে বিপুল লোকসানের কথা উল্লেখ করে ভর্তুকি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বিপিসি। সে সময় সংস্থাটি জানায়, প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকায় বিক্রি করা হলেও তা আমদানি করতে তাদের খরচ পড়ে ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ, প্রতি লিটারে লোকসান গুনতে হয় ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা।

একইভাবে ১২০ টাকার বিপরীতে প্রতি লিটার অকটেন আমদানিতে খরচ ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটার অকটেনে বিপিসির লোকসান ছিল ৩১ টাকা ৬১ পয়সা। ফলে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা না হলে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করে বিপিসি। এপ্রিল মাসের শুরুতে দেওয়া ওই চিঠির কিছুদিন পরই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার।

কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাব চলমান থাকায় লোকসানের মুখে রয়েছে বিপিসি। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগর থেকে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম, জাহাজ ভাড়া, যুদ্ধঝুঁকির বীমা, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য আমদানিসংশ্লিষ্ট খরচ বেড়ে যায়। যেহেতু জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়, তাই মুনাফায় থাকা সত্ত্বেও এর প্রভাব সরাসরি পড়ে বিপিসির ব্যয়ের ওপর।

সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা মুনাফা করে। এটি এর আগের অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২৭৩ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যার পেছনে খরচ হয় ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন ক্রুড অয়েল কিনতে খরচ হয় ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত তেল (ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন) আমদানিতে খরচ হয় ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন বাবদ খরচ হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। আর ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল আমদানিতে ব্যয় হয় ৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।

২০২২ সালে ডলার সংকট এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ৪৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও তা কমানো হবে। তবে, দীর্ঘ সময় দাম না কমায় বিপিসির মুনাফার পাল্লা ভারী হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের গড় মূল্য ছিল ৮৬ মার্কিন ডলার। জুনে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে প্রতি ব্যারেল অকটেনের দাম ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে ওঠে। জুনের শেষদিকে কিছুটা কমলেও জুলাইয়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে।

এর ফলে গত চার মাসের বিপুল আর্থিক লোকসানের কথা উল্লেখ করে ভর্তুকি চেয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। বিপিসির ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুন মাসের লোকসান বাবদ মোট ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেলেও সে অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে না। মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার সম্পূর্ণ চাপ অভ্যন্তরীণ বাজারে বহন না করে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আসছে। এর ফলে মার্চ মাসে ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, এপ্রিল মাসে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি ও জুন মাসে ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে বিপিসি।

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহের লক্ষ্যে চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল ক্রয় বাবদ ১৮ হাজার ৬৯৯.৩১ কোটি টাকা বিপিসির অনুকূলে ভর্তুকি হিসেবে প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

এ বিষয়ে বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, ভর্তুকি চেয়ে অর্থ বিভাগে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তার রেসপন্স এখনো আসেনি। আশা করছি আমরা সাড়া পাব।

বিপিসির মুনাফা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে যখন থেকে তেলের মূল্য নির্ধারণ করা শুরু হয়েছে, তখন থেকে যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত আমরা সরকারকে ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ ৭১ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারের আরেকটা তহবিলে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছি। বিপিসির যে মুনাফাটা রয়েছে, সেটা আমাদের প্রজেক্টের জন্য রাখা ছিল। সে টাকা দিয়েই জ্বালানি তেলের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা হয়েছে। সুতরাং বিপিসি মুনাফা করে এবং সরকারের ক্রান্তিকালে তাদের পাশে থাকে।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে