ঢাকা
ঢাকা, সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ১৪ সেকেন্ড পূর্বে
Home » সর্বশেষ » শুভ জন্মদিন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

শুভ জন্মদিন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

নবপ্রকাশ ডেস্ক:
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল: পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী, নাকি এক অসমাপ্ত রাজনৈতিক স্বপ্নের প্রতীক?

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এমন এক চরিত্র, যাঁকে এক বাক্যে বিচার করা কঠিন। তিনি ছিলেন নিম্নবর্ণের নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা একজন গুরুত্বপূর্ণ দলিত নেতা। ১৯০৪ সালের ২৯ জানুয়ারি তৎকালীন বরিশাল জেলার মৈস্তারকান্দি গ্রামে তাঁর জন্ম। পরবর্তীকালে তিনি ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনা করেন এবং আইনশাস্ত্রেও শিক্ষালাভ করেন।
তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—বর্ণ ও সামাজিক বৈষম্য থেকে দলিত জনগোষ্ঠী কীভাবে মুক্তি পাবে?

ব্রিটিশ ভারতের শেষপর্বে মণ্ডল মনে করতেন, উচ্চবর্ণের হিন্দু আধিপত্যের মধ্যে দলিতদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা কঠিন। এই বাস্তবতা থেকেই তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতার পথ বেছে নেন। তাঁর যুক্তি ছিল—বাংলার মুসলমান কৃষক ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দলিতদের অর্থনৈতিক স্বার্থের অনেক মিল রয়েছে।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তাঁর রাজনৈতিক জীবন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী হন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেন। এমনকি পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে তিনি অস্থায়ীভাবে সভাপতিত্বও করেন।
অর্থাৎ, একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন হিন্দু দলিত নেতার উঠে আসা ছিল তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

কিন্তু মণ্ডলের সেই রাজনৈতিক স্বপ্ন বেশিদিন টেকেনি।
জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ক্রমশ বাড়তে থাকে। পূর্ব বাংলার হিন্দু ও বিশেষ করে দলিত জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ নিয়ে তিনি সরকারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র দেন।
৯ অক্টোবর ১৯৫০ তারিখের পদত্যাগপত্রটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি। সেখানে তিনি পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া হিন্দু জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে বলে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত নানা নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন।

এরপর তিনি ভারতে ফিরে যান।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—ভারতেও তিনি আর আগের অবস্থানে ফিরতে পারেননি। পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। জীবনের শেষ পর্বে তিনি কলকাতার দরিদ্র দলিত অধ্যুষিত এলাকায় অনেকটা নিঃসঙ্গ অবস্থায় জীবন কাটান। ১৯৬৮ সালের ৫ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয় তাঁর মৃত্যু হয়।
তাহলে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত?

তাঁকে শুধু “ভুল রাজনীতির মানুষ” অথবা

“পাকিস্তানের সমর্থক” বললে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হয় না।
আবার তাঁকে শুধুই একজন নিপীড়িত দলিত নেতার প্রতীক হিসেবেও দেখলে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিতর্কিত দিকগুলো আড়াল হয়ে যায়।
তিনি এমন একটি সময়ে রাজনীতি করেছিলেন, যখন জাতপাত, ধর্ম, শ্রেণি, ঔপনিবেশিকতা এবং ভারত ভাগ—সবকিছু একসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছিল।

তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দলিতদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই রাজনৈতিক প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের জীবন তাই শুধু একজন রাজনীতিকের জীবনী নয়—এটি ক্ষমতা, পরিচয়, সংখ্যালঘু অধিকার, রাজনৈতিক জোট এবং রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির একটি গভীর ঐতিহাসিক পাঠ।
ইতিহাসের শিক্ষা কখনো শুধু “কে সঠিক, কে ভুল”—এত সরল নয়।

ইতিহাসের আসল শিক্ষা হলো—কেন একজন মানুষ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই সময়ের বাস্তবতা কী ছিল এবং সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি কী দাঁড়িয়েছিল।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে সেই জটিলতার মধ্যেই পড়তে হবে।

 

— মাহিন পাটোয়ারী নাহিদ

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে