স্টাফ রিপোর্টার (দৈনিক নবপ্রকাশ): কুমিল্লার শিশু অপ্রতিম হত্যা, ঢাকার শিশু রামিসা হত্যা কিংবা একের পর এক মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন—সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এসব ভয়াবহ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। বরং এগুলো বাংলাদেশের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুর রূপটিকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুরক্ষা ব্যবস্থা আজ তীব্র সংকটে।
মানবাধিকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে তুলে ধরে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশে সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ২১ জন ধর্ষণের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে এবং ১৭ জন শিশু আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।
অন্যদিকে, ডিএমপির হিসাব বলছে—২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা গেলেও এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি ছিল ২২ হাজার ৫৫০টি এবং ২০২৪ সালে ছিল ১৬ হাজার ৪১৪টি। যদিও প্রতিটি নিখোঁজ ঘটনাকে সরাসরি অপরাধ বৃদ্ধির সূচক হিসেবে না দেখে দ্রুত রিপোর্টিং ও অনুসন্ধান ব্যবস্থার আলোকেও বিশ্লেষণ করা জরুরি, তবুও নিখোঁজের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ইন্সপায়ার (INSPIRE) ফ্রেমওয়ার্ক’ এবং ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা যায়, শিশু নির্যাতন কেবল কোনো এক একক কারণ বা মানুষের স্বভাবের ফল নয়। ইউনিসেফের ‘বাংলাদেশ এমআইসিএস ২০২৫’ অনুযায়ী, ১-১৪ বছর বয়সী ৮৫.৭ শতাংশ শিশু দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক বা মানসিক শাসনের শিকার হয়।
সংবাদভিত্তিক শিশু অধিকার পর্যবেক্ষণের (২০২৫) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নথিভুক্ত ৩০৮টি যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রতিবেশী, পরিচিতজন, শিক্ষক, ধর্মীয় শিক্ষক বা নিকট আত্মীয়। অপরিচিতদের সম্পৃক্ততা ছিল মাত্র ৯.৭৪ শতাংশ। এছাড়া নথিভুক্ত ১২৪টি শিশু হত্যার ঘটনার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঘটেছে পরিবার বা বাড়ির সীমানার ভেতরে।
এই বাস্তবতায় শিশু সুরক্ষায় শুধু ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া বা কঠোর শাস্তির দাবিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়নির্ভর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে গোপনীয়তা রক্ষা করে একটি সমন্বিত তথ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। যেখানে পুলিশ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা এবং হেল্পলাইনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে আগাম ঝুঁকির ধরন (যেমন—পারিবারিক সহিংসতা, দীর্ঘ অনুপস্থিতি বা অভিভাবকের মাদকাসক্তি) শনাক্ত করা সম্ভব।
শিশু সুরক্ষা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিচার ব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং সরকারকে সঙ্গে নিয়ে একটি সর্বজনীন ‘জাতীয় শিশু নিরাপত্তা অঙ্গীকার’ বাস্তবায়ন করাই এখন সময়ের দাবি—যাতে আর কোনো অপ্রতিম বা রামিসাকে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়।
