ঢাকা
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ১ মিনিট আগে
Home » সর্বশেষ » মর্যাদার অমর লড়াই: থিয়েটার চারণিকের ‘কালযাত্রা’

মর্যাদার অমর লড়াই: থিয়েটার চারণিকের ‘কালযাত্রা’

বিনোদন ডেস্ক:

একজন মৃত নারীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে তাঁর মেয়েকে যখন একের পর এক সামাজিক ও ধর্মীয় নিষেধারোপের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াতে হয়, তখন মৃত্যুর চেয়েও নির্মম হয়ে ওঠে জীবিত মানুষের তৈরি করা সংকীর্ণতার দেয়াল। থিয়েটার চারণিকের নতুন প্রযোজনা ‘কালযাত্রা’ এমনই এক অস্বস্তিকর কিন্তু চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নাট্যমোদী দর্শককে।

মাহফুজা হিলালীর গল্প রচনায় এবং শামীম সাগরের নির্দেশনায় নির্মিত এই নাটকটি সম্প্রতি মঞ্চে এনেছে প্রতিশ্রুতিশীল নাট্যদল থিয়েটার চারণিক।

‘কালযাত্রা’ নাটকের মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে প্রিন্সেস মহিমা নামের একসময়ের যাত্রামঞ্চের তুমুল জনপ্রিয় শিল্পীর জানাজাকে কেন্দ্র করে। এটি কেবল একজন নারীর শেষ ইচ্ছা পূরণের গল্প নয়; বরং একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয়, নারীর সামাজিক অবস্থান, ধর্মের নামে সমাজপতিদের আরোপিত প্রথাগত বিধিনিষেধ এবং মৃত্যুর পর মানুষের ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকারকে ব্যবচ্ছেদ করার এক অনন্য নাট্যপ্রয়াস।

মঞ্চ থেকে জীবনের কঠিন লড়াই

নাটকটির গল্পে দেখা যায়, জীবনের আলো ঝলমলে মঞ্চে কোনো এক সময় সীতা, দ্রৌপদী কিংবা বেহুলার চরিত্রে রূপ দান করে দর্শদের মাতানো মহিমার ব্যক্তিজীবন কাটেনি সুখে। অপমান, সামাজিক লাঞ্ছনা ও না-পাওয়ার ক্ষত নিয়েই বিদায় নেন তিনি। মৃত্যুর পূর্বে মেয়ে কুমকুমের কাছে তাঁর একটাই চাওয়া ছিল—মর্যাদাপূর্ণ জানাজা। আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ এই ধর্মীয় অধিকারটুকু আদায় করতে গিয়ে মেয়ে কুমকুমের সামনে একে একে ভেসে ওঠে সমাজ ও ক্ষমতার রক্তচক্ষু। কুমকুমের এই লড়াই প্রমাণ করে, মানুষের চারপাশের প্রাচীরগুলো কেবল ইট-পাথরের তৈরি নয়; ভয়, সংকীর্ণতা ও সামাজিক কুসংস্কারও গড়ে তোলে দুর্ভেদ্য বাঁধা।

লোকজ ঐতিহ্য ও সমকালীন নারী সংকট

‘কালযাত্রা’ নাটকের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো যাত্রাশিল্পের লোকজ ঐতিহ্যকে বর্তমান যুগের সংকটের সাথে মেলাতে পারা। মহিমার অভিনীত সীতার অগ্নিপরীক্ষা, দ্রৌপদীর আকুল প্রশ্ন কিংবা বেহুলার দীর্ঘ ভেলা ভাসানোর স্মৃতি যখন বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন মঞ্চ ও জীবনের মধ্যকার পার্থক্য মুছে যায়। নাটকটি বাঙালির লোকজ উত্তরাধিকারকে কেবল স্মরণ করায় না, বরং আধুনিক সমাজে নারী এবং নারীশিল্পীদের টিকে থাকার জটিল মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তোলে।

নাটকটির একক অভিনয়ে সাফিয়া খন্দকার রেখা অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও আবেগঘন পারফর্মেন্স উপহার দিয়েছেন। নির্দেশক শামীম সাগর জানান, “নাটকটিকে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়নি; বরং ধর্মের নাম ভাঙিয়ে সমাজপতিদের তৈরি করা ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয় ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানবিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে।”

মানবিক মর্যাদার জরুরি বার্তা

শেষ বিচারে ‘কালযাত্রা’ নাটকের আলো নিভে যাওয়ার পরও দর্শকের মনে এক গভীর ও জরুরি প্রশ্ন জেগে থাকে—মৃত্যুর পরেও যদি একজন শিল্পীকে বা মানুষকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও ধর্মীয় অধিকার দেওয়া না যায়, তবে আমাদের মানবিকতার দাবি কতটুকু সত্য? কুমকুমের এই লড়াই শুধু তাঁর মায়ের অধিকারের লড়াই নয়, এটি মানুষের পরিচয় ও সামাজিক ট্যাবুর ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মর্যাদাকে জয়ী করার আহ্বান।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে