নিজস্ব প্রতিবেদক: শহীদ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিলের দাবি জানিয়েছে ‘মঞ্চ ২৪’। একইসঙ্গে বৈধ ও অবৈধভাবে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার (৬ জুন) বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী। সংবাদ সম্মেলনের ব্যানারে লেখা ছিল— “শহীদ ওসমান হাদী হত্যার বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিলের দাবিতে মঞ্চ ২৪-এর জরুরি সংবাদ সম্মেলন।”
সংবাদ সম্মেলনে ফাহিম ফারুকী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ঘিরে এখনো বহিঃশক্তির প্রভাব ও আধিপত্যের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল এ দেশের সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের ফসল এবং দেশের মানুষই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ আর কোনো বহিঃশক্তির আধিপত্য মেনে নেবে না। যে রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, জনগণের জানমালের ক্ষতি করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়, সেই রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের জনগণ বন্ধু হিসেবে মেনে নিতে পারে না।”
ফাহিম ফারুকী অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ডানপন্থী, বামপন্থী, ইসলামপন্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। জনগণের সেই আন্দোলনের মাধ্যমেই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, শহীদ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী অবস্থানের কারণেই হাদীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের কোনো সংস্থা এ ঘটনায় জড়িত নয়। বরং এটি পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার গোয়েন্দা সহযোগিতার ফল।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “হাদী হত্যার বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ বন্ধ রাখতে হবে। গার্মেন্টস সেক্টরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করতে হবে।”
তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে বাংলাদেশে সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি ভারতীয় নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। কিছু প্রতিবেদনে এই সংখ্যা আড়াই লাখ থেকে পাঁচ লাখ পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ দেশের তরুণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফাহিম ফারুকী বলেন, “বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী সরকারি হিসাবে ১ হাজার ৯০৮ জন ভারতীয় নাগরিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। আমরা এই বৈধ ওয়ার্ক পারমিটগুলো অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।”
এ সময় তিনি সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বক্তব্যেরও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আসিফ নজরুল দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় শ্রমিক কাজ করছেন। যদিও এই সংখ্যার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে বিদেশি শ্রমিকের উপস্থিতি যে উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।”
সংবাদ সম্মেলনে পিলখানা হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ফাহিম ফারুকী। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র হয়েছে, সেসব ঘটনায় বিদেশি শক্তির সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে কেবল ন্যায্যতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক চায়। কিন্তু কোনো ধরনের আধিপত্যবাদী আচরণ কিংবা অন্যায় সুবিধা গ্রহণের সুযোগ জনগণ দিতে চায় না।”
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক বলেন, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী অবস্থানের কারণে তিনি নিয়মিত হুমকি পাচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, যেকোনো সময় তার প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সরকারের কাছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের বিচারের সময় নির্ধারণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে। বক্তারা বলেন, সরকার যদি দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তবে জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করে বক্তারা বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ চরম কষ্টে রয়েছে। লুটপাট ও দুর্নীতি বন্ধ করে জনগণের কল্যাণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চ ২৪-এর নেতাকর্মী ও বিভিন্ন পর্যায়ের সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন।
