নবপ্রকাশ ডেস্ক
১১ অক্টোবর ২০২৬
বিয়ের শর্ত কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার বিনিময় ছাড়া কেবল ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে অর্থ চাওয়াকে আইনগতভাবে ‘যৌতুক’ হিসেবে গণ্য করা যায় না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সাথে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও চিকিৎসা সনদে গুরুতর অসংগতি থাকায় মামলার অভিযোগকে ‘সাজানো ও ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিয়ে নিম্ন আদালতের সাজা বাতিল করে মো. রাসেল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (১১ অক্টোবর) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সেলিমের একক বেঞ্চ এ সংক্রান্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নিম্ন আদালতের রায়
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী মো. রাসেল উদ্দিন ও ইসমত আরা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের প্রায় সাড়ে তিন বছর পর, ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরের বাইতুশ শরফ মসজিদ রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় একটি অপ্রীতকর ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন স্ত্রী।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, ওই দিন রাসেল উদ্দিন ব্যবসার কাজে ব্যবহারের জন্য স্ত্রীর কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করেন। স্ত্রী টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে কাঠের লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেন ইসমত আরা বেগম।
মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ রাসেল উদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ট্রাইব্যুনাল তাকে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল আবেদন করেন সাজাপ্রাপ্ত রাসেল উদ্দিন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি ব্যাখ্যা
আপিল শুনানিকালে মামলার সাক্ষ্য, নথিপত্র ও মেডিক্যাল রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন হাইকোর্ট। পর্যালোচনা শেষে বিচারক গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন:
-
যৌতুকের আইনগত সংজ্ঞা: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ২(ঞ) ধারায় যৌতুকের সংজ্ঞায় অর্থ দাবির উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতি বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেন, ব্যবসার প্রয়োজনে অর্থ চাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলেও তা বিয়ের শর্ত বা বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিনিময়ে দাবি করা হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে এটি যৌতুক হিসেবে প্রমাণিত হয় না।
-
সাক্ষ্য ও চিকিৎসা সনদে অসংগতি: নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বাদী তার জবানবন্দিতে লাঠির আঘাতে ডান কাঁধ ও পিঠে আঘাত পাওয়ার কথা জানান। তবে চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও হাসপাতালের মেডিক্যাল সনদে বাঁ কাঁধে আঘাতের কথা উল্লেখ ছিল। আঘাতের স্থান নিয়ে এই বৈপরীত্যের কারণে নির্যাতনের অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ হয় বাদীপক্ষ।
রায়ের তাৎপর্য
সামগ্রিক তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট স্পষ্ট জানান, স্ত্রীর কাছে সাধারণ আর্থিক লেনদেন বা ব্যবসার তাগিদে টাকা চাওয়ার ঘটনা থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘যৌতুক’ দাবির অপরাধে পরিণত হয় না। আইনগত সংজ্ঞা, অর্থ দাবির প্রেক্ষাপট এবং সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে হবে।
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতের দেওয়া ২ বছরের সাজা বাতিল করে মো. রাসেল উদ্দিনকে পুরোপুরি খালাস প্রদান করেন হাইকোর্ট।
