ঢাকা
ঢাকা, বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ৩৮ সেকেন্ড পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
শেষ আপডেট ৫ মিনিট পূর্বে
Home » সর্বশেষ » ‘দৃশ্যম’–কেও হার মানাল যে সিনেমা!

‘দৃশ্যম’–কেও হার মানাল যে সিনেমা!

বিনোদন ডেস্ক:

মালয়ালম সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি গত এক দশকে দুর্দান্ত সব থ্রিলার বানিয়েছে। বিশেষ করে পুলিশি তদন্ত নিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রির সাফল্য ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশে মালয়ালম থ্রিলার–ভক্তের অভাব নেই। এসব সিনেমা আসামাত্রই তৈরি হয় বাংলা সাবটাইটেল। তবে মালয়ালম থ্রিলারের কথা এলেই সবার আগে আসে ‘দৃশ্যম’–এর নাম। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া জিতু জোসেফের সিনেমাটির প্রভাব এতটাই যে প্রথম কিস্তি মুক্তির পর এক যুগে এসেছে আরও দুই কিস্তি, এসেছে হিন্দি রিমেকও। পুলিশি তদন্ত নিয়ে থ্রিলার ভালো হলেই অবধারিতভাবে আসে ‘দৃশ্যম’–এর সঙ্গে তুলনা। সেটাই হয়েছে নতুন মালয়ালম থ্রিলার ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’–এর ক্ষেত্রেও। অল্প বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি গত মাসে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর দুর্দান্ত ব্যবসা করে। ৯ অক্টোবর এসেছে ওটিটিতেও। সিনেমাটি দেখার পর অনেক দর্শকের মন্তব্য—‘দৃশ্যম’–এর চেয়ে ভালো! সত্যিই কি এতটা ভালো সিনেমাটি?

একনজরে
সিনেমা: ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’
ধরন: ক্রাইম–থ্রিলার
পরিচালনা: শাহাদ
অভিনয়ে: পার্বতী, বিজয়ারাঘবন, সিদ্ধার্থ ভরতন, ম্যাথু থমাস, বিনয় ফোর্ট ও উন্নিমায়া প্রসাদ।
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
দৈর্ঘ্য : ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট

‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ অর্থ প্রথম দৃষ্টিতে অপরাধী। সিনেমায় পুলিশের কর্মকর্তাদের পরিচয় করিয়ে দিতেই চিত্রনাট্যকারেরা কেন এতটা সময় ব্যয় করছেন, শুরুতে এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়, চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন ও দুর্বলতাগুলো তুলে ধরার পেছনে নির্মাতাদের বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে।
ছবিটির সঙ্গে যৌক্তিক কারণেই জিতু জোসেফের ‘দৃশ্যম’–এর মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেক দর্শক। কারণ, সেই ছবিতেও অপরাধে জড়িয়ে পড়া একটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দর্শকেরা। তবে ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ অপরাধের বিষয়টিকে দেখেছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এখানে গল্পের বাঁক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ কোন চরিত্রের চোখ দিয়ে দর্শক ঘটনাগুলো দেখছেন।

‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ অর্থ প্রথম দৃষ্টিতে অপরাধী। সিনেমায় পুলিশের কর্মকর্তাদের পরিচয় করিয়ে দিতেই চিত্রনাট্যকারেরা কেন এতটা সময় ব্যয় করছেন, শুরুতে এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়, চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন ও দুর্বলতাগুলো তুলে ধরার পেছনে নির্মাতাদের বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে।
ছবিটির সঙ্গে যৌক্তিক কারণেই জিতু জোসেফের ‘দৃশ্যম’–এর মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেক দর্শক। কারণ, সেই ছবিতেও অপরাধে জড়িয়ে পড়া একটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দর্শকেরা। তবে ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ অপরাধের বিষয়টিকে দেখেছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এখানে গল্পের বাঁক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ কোন চরিত্রের চোখ দিয়ে দর্শক ঘটনাগুলো দেখছেন।

ছবির বড় অংশজুড়ে কাহিনি এগোয় আলিনার (পার্বতী থিরুভোথু) দৃষ্টিভঙ্গিতে। সদ্য স্বামীকে হারিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর পুলিশের চাকরিটা পেয়েছেন। ছোট একটা মেয়ে আছে আলিনার। মেয়েই তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। প্রশিক্ষণ শেষে নতুন থানায় দায়িত্ব নিতে এসে আলিনার পরিচয় হয় জ্যেষ্ঠ কনস্টেবল দিব্যার (উন্নিমায়া প্রসাদ) সঙ্গে। একাধিকবার চেষ্টা করেও মা হতে পারেননি দিব্যা। অন্যদিকে দাসন (সিদ্ধার্থ ভরতন) ও শ্রীনাথের (ম্যাথু থমাস) জীবনেও নতুন অধ্যায় শুরুর অপেক্ষা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে তাঁরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
এই পুলিশ কর্মকর্তাদের জীবনযাপন ও তাঁদের কর্মস্থল—সবকিছুতেই সাধারণত্বের ছাপ। তাঁরা নিখুঁত, আদর্শবান কিংবা সব সময় ন্যায়ের পক্ষে থাকা সিনেমার চেনা পুলিশ নন; বরং অহংকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁদের বিবাদে জড়াতে দেখা যায়। আবার রোজকার দায়িত্বও পালন করেন খুব সাধারণভাবেই। কিন্তু এই চারজন যখন এমন একটি ভুল করে বসেন, যার পরিণতি তাঁদের সবার সামর্থ্য ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখনই গল্প মোড় নেয়।

‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ধরন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ধরন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

নৈতিকতা ও আইনের মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখাই ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’কে দুর্দান্ত সিনেমায় পরিণত করেছে, যা ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে, শেষ পর্যন্ত তার প্রায় সবই ঘটে। তবে এখানে ‘দৃশ্যম’–এর জর্জকুট্টির মতো কোনো অসাধারণ বুদ্ধিমান, ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী নেই। এই চার পুলিশ কর্মকর্তা যে ব্যবস্থার অংশ, সেই ব্যবস্থাকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করার কৌশলেও তাঁরা বিশেষ দক্ষ নন। কিন্তু নিজেদের কাজের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা বোঝার মতো জ্ঞান তাঁদের আছে। এই উপলব্ধিই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এমন সময় গল্পে প্রবেশ করেন তারকা পুলিশ কর্মকর্তা হ্যারিস মিরান (বিজয়ারাঘবন)।

আগের চরিত্রগুলোকে দেখে যদি কারও মনে হয়, তাঁরা বুঝি প্রচলিত অর্থে ‘পুলিশি সিনেমা’র উপযুক্ত নায়ক নন, তবে মিরান ঠিক সেই ধরনের কর্মকর্তা, যাঁকে কেন্দ্র করে সাধারণত এ ধরনের সিনেমা তৈরি হয়। একদিকে ভুল করে বিপাকে পড়া সাধারণ কয়েকজন পুলিশ সদস্য, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সুনামের অধিকারী এক আদর্শ পুলিশ কর্মকর্তা। এই দুই বিপরীত মেরুর সংঘাত থেকেই তৈরি হয় ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক—এখানে ‘ভালো’ পুলিশ সদস্যদের মুখোমুখি হতে হয় সেরা পুলিশ কর্মকর্তার।

শুরুতে মিরানকে দেখা যায় এক আদর্শবান পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে, যিনি নিয়ম মেনেই কাজ করেন। কিন্তু মামলাটি যত এগোয়, ততই তাঁর নৈতিক দৃঢ়তায় ফাটল ধরতে থাকে। যেকোনো ভালো পুলিশি থ্রিলারের মতো এখানেও অহং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় পদমর্যাদাজনিত অস্বস্তি। নিজের চেয়ে বহু বছরের ছোট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা মিরানের বিচারবুদ্ধিকেও প্রভাবিত করে।

‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ধরন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ধরন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

পরিচালক শাহাদের আগের ছবি ‘প্রকাশন পারাক্কাট্টে’ খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। তবে নতুন ছবিতে তিনি নিজের নির্মাণশৈলীকে অনেকটাই শাণিত করেছেন। প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য সত্ত্বেও কাহিনি অধিকাংশ সময় দর্শককে ধরে রাখে। মাঝেমধ্যে গল্প এগিয়ে নিতে চিত্রনাট্যে কিছু সুবিধাজনক পরিস্থিতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সামগ্রিক রোমাঞ্চ নষ্ট করে না। চিত্রনাট্যকার পি এস সুব্রামানিয়ান ও বিজেশ থোত্তিঙ্গাল এমন এক অতিবাস্তবধর্মী পুলিশি থ্রিলার নির্মাণ করেছেন, যা দর্শককে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ তো দেয়ই না; বরং সব সময় অস্বস্তিতে রাখার পণ করে এগোয়।

গল্পের একটি চরিত্রের লেখা বইকে সিনেমার কাহিনির অগ্রগতিতে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাও দারুণ। এটা শুধু একটি উপকরণ হয়ে থাকে না; বরং রহস্যের স্তর উন্মোচনেও ভূমিকা রাখে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, থানার ভেতরের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি আর তদন্তের নানা বাঁকের মধ্যে চিত্রনাট্যকারেরা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হাস্যরসও ব্যবহার করেছেন। ফলে ছবির গাম্ভীর্য কিছুটা হালকা হয়, কিন্তু মূল রহস্যের গুরুত্ব কমে না।

‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ধরন’–এর পোস্টার। আইএমডিবি
‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ধরন’–এর পোস্টার। আইএমডিবি

অভিনয়ে পার্বতী ছবিটির আবেগের কেন্দ্র। নতুন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর চরিত্রে রয়েছে সতর্কতা ও অনভিজ্ঞতার ছাপ; আবার প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার দৃঢ়তাও আছে। এই দুই দিকের ভারসাম্য তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে হ্যারিস মিরান চরিত্রে বিজয়ারাঘবন পর্দায় এমন এক তদন্তকারীর উপস্থিতি তৈরি করেন, যাঁর সামনে নিখুঁত অপরাধও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যেতে পারে বলে মনে হয়।

মালয়ালম সিনেমার বেশ কিছু পুলিশি তদন্তনির্ভর ছবিতে যখন একই ধরনের গল্প বলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তখন ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ সেই ধারায় নতুনত্ব নিয়ে এসেছে। এটা এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর সিনেমা, যেখানে প্রায় প্রত্যেকের নৈতিক অবস্থানই প্রশ্নবিদ্ধ। তবু দর্শক হিসেবে কোনো না কোনো পক্ষ বেছে নিতে মন চায়। কখনো মনে হয়, গল্পের রহস্য ও পরিণতি সম্পর্কে অনেক কিছুই বুঝে ফেলেছি। কিন্তু সিনেমাটি বারবার বুঝিয়ে দেয়, দর্শকের ধারণার চেয়ে গল্পটি কয়েক ধাপ এগিয়ে। ‘দৃশ্যম’–এর সঙ্গে তুলনায় যাওয়ার দরকার নেই, থ্রিলার–ভক্ত হলে এই সিনেমা মিস করবেন না।

নবপ্রকাশ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

সর্বশেষ খবর

আরো দেখতে