১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গত ছয় মাসে বর্তমান নির্বাচিত সরকার জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি দাবি করেন, এ সময়ে দেশে কোনো রাজনৈতিক হয়রানি হয়নি এবং সর্বোচ্চ বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস (১৮০ দিন) পূর্তি উপলক্ষে সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ১৮০ দিনের বিভিন্ন সাফল্য, সংস্কার কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, ২০১৪ সালের বিনা ভোট, ২০১৮ সালের নিশিরাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ডামি ভোটের নির্বাচন পেরিয়ে সদ্য অনুষ্ঠিত অংশগ্রহণমূলক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই শতাধিক অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ কায়েমকারী সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন জানান, দায়িত্বগ্রহণের পরপরই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এর সুবিধা পেয়েছে ১৩ লাখ কৃষক পরিবার। কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালু করা হয়েছে। পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৬০টির বেশি পণ্যে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট নিরসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি আলাপের প্রেক্ষিতে পেট্রোনাসের মাধ্যমে গ্যাস সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তদের এক লাখ টাকা করে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী বছর থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই, স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির কথা জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের ধারাবাহিকতা ভেঙে রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত সেবামূলক পুলিশ ও প্রশাসন তৈরি করা হয়েছে। সোহাগী জাহান তনু এবং শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যার আসামিকে বহু বছর পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিস্ট এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশে আবেদন জানানো হয়েছে এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে।
বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই নীতি ধারণ করে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান ঘটানো হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া বিশ্বমঞ্চে আমাদের গৌরবান্বিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাধারণ জীবনাচার তুলে ধরে তাঁর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভিআইপি সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসেছেন। তিনি বারবার তৃণমূলে ছুটে যাচ্ছেন, কোদাল হাতে খাল খননে নেমে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ এমন একটি সরকার পেয়েছে, যাকে তারা আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে ধারণ করে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রকল্প গ্রহণ, পতিত কলকারখানা চালু, বন্ধ বন্দরগুলো ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন মাহদী আমিন।
