নবপ্রকাশ ডেস্ক:
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে চলতি অক্টোবর মাসেই বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই বিশাল আর্থিক দায়ভার মেটানোসহ দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে চলতি অক্টোবর মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের কোনো একক মাসে সর্বোচ্চ। তবে এই ঋণের একটি বড় অংশই খরচ হবে সরকারের পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও সমন্বয়ের কাজে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাজেট ঘাটতি পূরণ ও রাষ্ট্র পরিচালনা সচল রাখতে ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের এ প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক একটি আর্থিক ব্যবস্থার অংশ। তবে বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারের পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে আশানুরূপ রাজস্ব আদায় না হওয়া এবং বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড়ের চেয়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণের ওপর চাপ বাড়াতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, অক্টোবর মাসেই সরকারি চাকুরিজীবীদের বকেয়াসহ নতুন স্কেলে বর্ধিত বেতন সুবিধা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া শুরু হবে। এছাড়া বাজারে আশানুরূপ বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকায় বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে জুলাই মাসে মাত্র ৪.৬২ শতাংশে নেমে এসেছে। বেসরকারি খতের ঋণ চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে প্রচুর উদ্বৃত্ত তারল্য পড়ে রয়েছে, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণ নিলেও বাজারে সুদের হার লাফিয়ে বাড়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নিলামের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বন্ড ও বিল ইস্যুর মাধ্যমে সরকার ইতোমধ্যেই বড় অঙ্কের ঋণ তোলা শুরু করেছে:
-
মঙ্গলবার বন্ড নিলাম: ৩ বছর মেয়াদে ৯.১২ শতাংশ সুদে ৮০০ কোটি এবং ২ বছর মেয়াদে ৮.২০ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।
-
রোববার ট্রেজারি বিল নিলাম: ৯১ দিন মেয়াদে ৮.১৩ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি, ১৮২ দিন মেয়াদে ৮.৩৭ শতাংশ সুদে ৩ হাজার কোটি এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে ৮.৫৯ শতাংশ সুদে ২ হাজার কোটি টাকাসহ সর্বমোট ১০ হাজার কোটি টাকা তুলে নেয় সরকার।
অক্টোবর মাসের বাকি সময় জুড়ে ট্রেজারি বিলের বিপরীতে আরও ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং বন্ডের বিপরীতে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা গ্রহণের তফসিল চূড়ান্ত করা হয়েছে। পরবর্তী দুই মাস—নভেম্বরে ৫৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরে ৩৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছিল সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার নিট ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকায়। তবে এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন করে টাকা না ছাপিয়ে উল্টো ৩ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ শোধ করা হয়েছে, ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের দেনা কমে ৯০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের নিট ঋণের স্থিতি ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা বেড়ে আগস্ট শেষে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮ হাজার ২৬ কোটি টাকায়।
উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক খাত থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত অর্থবছরে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শেষ পর্যন্ত সরকারকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিতে হয়েছিল।
