নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা: গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে খুলনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় মহাসমাবেশ। শনিবার (২০ জুন) খুলনা মহানগরীর ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস ময়দানে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক অংশ নেন। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই খুলনা নগরীর বিভিন্ন সড়কে নেতাকর্মীদের মিছিল ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
১১ দলীয় ঐক্য খুলনা বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আজও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের জনগণ ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়। সেই লক্ষ্যেই ১১ দলীয় ঐক্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ চরম কষ্টে রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে জনগণের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ধর্ষণ, হত্যা, গুম ও সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে সরকারের সমালোচনা করেন।
সীমান্ত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ সবসময় আগ্রহী। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ ইস্যু নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অতীতেও ভূমিকা রেখেছে, ভবিষ্যতেও রাখবে। কোনো ধরনের অন্যায়, বৈষম্য কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কাছে তারা মাথানত করবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংকট তৈরি হয়েছে। জনগণের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হলে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্য ও জনগণের শক্তির মাধ্যমেই দেশের চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সমাবেশে বক্তব্য দেন এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, ইসলামী আন্দোলনের নেতা মামুনুল হক, এনসিপির নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি রাশেদ প্রধানসহ জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
কর্নেল অলি আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, দেশের মানুষ একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে চায়। রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মামুনুল হক বলেন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন। তিনি দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলনকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি। তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্য, বাজেট বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, দেশের রাজনীতিতে নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাশেদ প্রধান তার বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
সমাবেশস্থলে খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলা থেকে আগত নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন। দুপুরের আগেই সার্কিট হাউস ময়দানের অধিকাংশ অংশ পূর্ণ হয়ে যায়।
সমাবেশে বক্তারা দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তারা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এ সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির ইঙ্গিত এবং আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বিকেলে সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সমাপনী বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।
খুলনায় অনুষ্ঠিত এই বিভাগীয় মহাসমাবেশকে ১১ দলীয় ঐক্যের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক সমাবেশ হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, এই সমাবেশ দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানকে আরও সুস্পষ্ট করেছে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করেছে।
