জবি প্রতিনিধি: ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান—দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ২য় যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান রুমি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজপথে অবস্থান করেন এবং সহযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন।
কোটা আন্দোলনের সূচনালগ্নে, জুন মাস থেকেই তিনি আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানান। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এবং গ্রেফতারের ঝুঁকি থাকায় প্রথমদিকে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। তবে তিনি সহযোদ্ধাদের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেন। সে সময় তিনি সহযোদ্ধাের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “আমরা রাজনীতি করি দেশ ও মানুষের কল্যাণে। আমাদের অবশ্যই শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে হবে।”
৭, ৮ ও ৯ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য পানি ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করে তাদের পাশে দাঁড়ান।
১১ জুলাই শাহবাগ অবরোধ কর্মসূচি ছিল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যখন শাহবাগে যাওয়া নিয়ে দ্বিধায় পড়ে, তখন রুমি সহযোদ্ধাদের নিয়ে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীদের একত্রিত করেন। তাঁতিবাজার থেকে মিছিল নিয়ে পুলিশের একাধিক ব্যারিকেড অতিক্রম করে শাহবাগে পৌঁছান। তার মতে, ওই মুহূর্তে শাহবাগে পৌঁছাতে পারা আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন সাহস ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল।
এবং এ সময় তিনি শাহবাগমুখি মিছিলে স্লোগান দিতেছিলেন,”একটা গুলি চললে, দশটা গুলি চলবে।”
“একটা বোমা ফাটলে, দশটা বোমা ফাটবে।”
“আপোষ না সংগ্রাম?”
“সংগ্রাম, সংগ্রাম।”
ঐ মিছিলে উপস্থিত অনেকে তখন তাকে এসব স্লোগান না দিতে অনুরোধ করেছিলেন,কারণ আন্দোলনটি তখনও মূলত কোটা সংস্কারকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু তিনি সচেতনভাবেই এসব স্লোগান দিয়েছিলেন। এবং তিনি বিশ্বাস করতেন, এর মাধ্যমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বৈরাচারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের বিষবাষ্পের চেতনা আরও শক্তিশালী হবে।
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে আসেন তিনি। পরদিন ১৬ জুলাই পল্টনে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন। ওই সময় সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সাহস নিয়ে আমাদের এই আন্দোলনে থাকতে হবে। সাহসীরাই নতুন পথ তৈরি করে। ইনশাআল্লাহ আমরাও নতুন পথ তৈরি করবো।
শেখ হাসিনা আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে না”।
একই দিনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে কয়েকজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় রুমিও আহত হন বলে জানা যায়।
১৯ জুলাই কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের পরও তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা এবং গুলিবর্ষণের মধ্যেও আন্দোলন অব্যাহত থাকে। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে অনেক আন্দোলনকারী পিছিয়ে যেতে শুরু করেন। তখন রুমি সবাইকে উদ্দেশ করে বলেন, “সামনে আসেন, এদিকে আসেন। যুদ্ধে নেমে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে না। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে।”
তার দাবি, ওই দিনের সংঘর্ষে তার সামনেই কয়েকজন নিহত হন এবং তিনিও মৃত্যুঝুঁকির মুখোমুখি হন। তবে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে ফিরে আসেন।
কারফিউ-পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে আন্দোলনের সমন্বয় বজায় রাখেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়। আন্দোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে গ্রেফতারের জন্য একাধিকবার তার বাসায় অভিযান চালানো হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
২১ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পরও তিনি আন্দোলনকে সমাপ্ত মনে করেননি। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আলোচনা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজপথে কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন।
৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঘোষিত এক দফা কর্মসূচিতে এবং ৪ আগস্ট ক্যাম্পাস এলাকা ও রায়সাহেব বাজারে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট ‘গণভবনমুখী যাত্রা’ কর্মসূচির দিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে অবস্থান করেন। নাজিরাবাজার এলাকায় সংঘর্ষের পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল ও শহীদ মিনার এলাকায় পৌঁছান। পরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে শাহবাগমুখী মিছিলে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন।
রুমি জানান,দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি ১৫টিরও বেশি মামলার আসামি হয়েছেন, ছয়বার কারাবরণ করেছেন এবং অসংখ্যবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে কোনো বাধাই তাকে রাজপথের সংগ্রাম থেকে সরাতে পারেনি।
তার ভাষায়, “জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বিজয়। এই বিজয়ের ভিত্তি নির্মিত হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, জেল-জুলুম এবং অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের ওপর।”
তিনি মনে করেন, অর্জিত বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানুষের ভোটাধিকার ও মৌলিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচার বা দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
