নবোপ্রকাশ ডেস্ক:
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছরের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু আইফোন ছিনতাই নয়, বরং মাদক সিন্ডিকেটের প্রতিশোধ ও গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে শিক্ষক ড. নাহিদার কঠোর পদক্ষেপের কারণেই স্থানীয় লালমাই-সালমানপুর এলাকার মাদকচক্র দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা শেষে কৌশলে কিশোর অপ্রতিমকে হত্যা করেছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ছবি তোলার প্রলোভন দেখিয়ে অপ্রতিমকে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায় তুহিন নামের এক কিশোর। সেখানে আগে থেকেই ওতপেতে থাকা ফাহাদ ও কামরুলসহ অন্য ঘাতকরা তাকে শ্বাসরোধ করে এবং বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতিমকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তার মা ড. নাহিদা বেগম। মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা কোটবাড়ীর বাসভবনে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ ও বিচারহীনতার শঙ্কা প্রকাশ করেন।
ড. নাহিদা বেগম বলেন, “আমার দুধের শিশু, তাকে ভিকটিম ব্লেমিং করা আমি কোনোদিন মেনে নেব না। তাকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, দীর্ঘদিন সময় নিয়ে বন্ধু বানিয়ে এখন বলা হচ্ছে— সে নাকি তাদেরই সদস্য ছিল! উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি শুধু আমার ছেলের বিচার চাই না। এসব অপরাধীরা জেল থেকে বের হলে আরও কত বাচ্চার জীবন শেষ করবে, তা নিয়ে আমি চিন্তিত। মূল কুশীলবদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।”
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে প্রক্টর মেয়াদের মাদকবিরোধী অভিযান
স্থানীয় ও অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এক মাসের জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেন ড. নাহিদা বেগম। ওই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মাদকসেবনরত অবস্থায় সালমানপুর এলাকার ৮ কিশোরকে আটক করে শিক্ষার্থীরা। প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. নাহিদা তাদের পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। ওই ঘটনার তদন্তেই সালমানপুর এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী মিলন ও আল-আমিনের নাম উঠে আসে।
অনুসন্ধান বলছে, মাদকবিরোধী ওই পদক্ষেপের পর থেকেই তৎকালীন প্রক্টর ও তার পরিবারের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয় স্থানীয় কিশোর গ্যাং এবং মাদক সিন্ডিকেট। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে তার ১৩ বছরের নিষ্পাপ সন্তানকে টার্গেট করা হয়।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে এসব অপরাধী যেন ছাড়া না পায়। জেল থেকে বেরিয়ে তারা ভবিষ্যতে আরও বড় খুনখারাবি করতে পারে।”
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশের দাবি, অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সদর দক্ষিণ থানার পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত চার ঘাতক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে আইফোন ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেছে।
তবে অপ্রতিমের পরিবারের উত্থাপিত মাদক সিন্ডিকেটের ইন্ধনের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি জানান, ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হলেও অন্য সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সদর দক্ষিণ থানার ওসি রকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। তদন্তে অন্য কারও ইন্ধন বা সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
